

মো: ইব্রাহীম মিঞা, বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার বিনাইল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পুইনন্দা গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে একটি অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—‘প্রভাতী বিদ্যানিকেতন’। ২০২০ সালে করোনার পর নিজ উদ্যোগে বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেন সাহসী নারী মোছাঃ রেহেনা পারভীন। বর্তমানে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৭০ জন শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।
কিন্তু শিক্ষার এই মহৎ প্রয়াসের পেছনে রয়েছে অবর্ণনীয় কষ্টের গল্প। একটিমাত্র ঘর ও দুই পাশের খোলা বারান্দায় তিন ভাগে বিভক্ত করে দুই শিফটে চলে পাঠদান। ঝড়-বৃষ্টি, প্রচণ্ড গরম কিংবা শীত—সব পরিস্থিতিতেই শিক্ষার্থীরা চটের ওপর মাটিতে বসে শিক্ষা গ্রহণ করে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রেহেনা পারভীন জানান, শিশু শ্রেণিতে ৪২ জন, প্রথম শ্রেণিতে ৩০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩৫ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ১৫ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ১৩ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ১৩ জন শিক্ষার্থী প্রতিদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে। প্রতিদিন গড়ে ১৩৫-১৫৫ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করছে।
এই বিদ্যালয়টি শুধু বিনাইল ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের নয়, পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী উপজেলার বেতদিঘী ইউনিয়নের ঝকঝকা, নয়াপাড়া, আরজিশাহপুর, তিলবাড়ি ও ঘাটপাইল গ্রামের শিক্ষার্থীরাও হেঁটে আসে শিক্ষা অর্জনের জন্য।
পাঁচজন শিক্ষক অতি সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিদ্যালয়টি চালাচ্ছেন। সহকারী শিক্ষকরা জানান, মাসিক বেতন ৩,০০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩,৫০০ টাকা। বিদ্যালয়ের জন্য একটি টয়লেট ও টিউবওয়েলও স্থাপন করেছেন প্রধান শিক্ষিকা ব্যক্তিগত উদ্যোগে।
শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সন্তান। অনেকেই বেতন দিতে পারে না। তারপরও বিদ্যালয়টি চালু রাখার জন্য শিক্ষকদের সঙ্গে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রধান শিক্ষিকা।
শিশু শ্রেণির এক অভিভাবক বলেন, “শিক্ষার মান ভালো হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকেও বাচ্চাদের এখানে পড়াতে আনি। কিন্তু খোলা বারান্দায় মাটিতে বসে পড়াশোনা করা কষ্টকর।”
বিদ্যালয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে নিবন্ধিত হওয়ায় সরকারি পাঠ্যবই পেলেও অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। অথচ একই উপজেলার কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৭-৩০ জন হলেও সেখানে কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি—সরকারি সহায়তায় যদি অন্তত বেঞ্চের ব্যবস্থা ও একটি উপযুক্ত ভবন নির্মাণ করা যায়, তাহলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা আবার বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে।
এ বিষয়ে স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা—সরকার ও দাতা সংস্থাগুলোর সুদৃষ্টি। কারণ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে প্রভাতী বিদ্যানিকেতনের মতো বিদ্যালয়গুলো এখনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
