ঢাকা
logo
প্রকাশিত : November 2, 2026

মার্কিন নির্বাচন শেষ হলেই ফের ইরান যুদ্ধের শঙ্কা, আতঙ্কে মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে আবারও সামরিক সংঘাতে জড়াতে পারে ওয়াশিংটন—এমন আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে বসবাসকারীদের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর উদ্বেগ বাড়ছে। সম্ভাব্য সংঘাতের কথা মাথায় রেখে অনেকেই ভ্রমণ, সন্তানদের স্কুল এবং কর্মস্থল নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তিনি জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটনের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি তিনি। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর আশঙ্কা করছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বাসিন্দারা।

ট্রাম্পের বক্তব্যে বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূচনা হয়। সংঘাতের অষ্টম মাসে এসে দুই পক্ষের মধ্যে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকলেও সামরিকভাবে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সুবিধা অর্জন করতে পারেনি।

এ অবস্থায় ট্রাম্প কখনো ইরানে নতুন করে হামলার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, আবার কখনো আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কথা বলছেন। চলতি মাসের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কোনো অবস্থাতেই ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেননি।

গত শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নেতার আলোচনায় ইরান পরিস্থিতি গুরুত্ব পেয়েছে। রোববার এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে।

নতুন অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে ইরানের হুঁশিয়ারি
অন্যদিকে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি করছে ইরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগের তুলনায় আরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলেছে তেহরান।

ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটি শুধু তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। সম্ভাব্য এই সংঘাতকে তিনি দীর্ঘস্থায়ী ‘চমকের যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নতুন কোনো হুমকি এলে ‘ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই’ জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থানও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।

সৌদি আরব, আমিরাত ও বাহরাইনে উদ্বেগ
সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকেরা। সৌদি আরবে বসবাসরত ৩৬ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, পরিস্থিতির কারণে মানুষের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। সবাই এখন আগের চেয়ে বেশি সতর্ক এবং পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই সৌদি আরব ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সৌদি আরবের কয়েকটি এলাকায় বড় আয়োজন বাতিল করা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যালয় বন্ধ রেখে কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদানের পরিবর্তে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আসন্ন ছুটির মৌসুমে বিমান চলাচল ব্যাহত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে মে মাসের পর থেকে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। তারপরও নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি তেল কোম্পানি একটি বড় তেল সম্মেলনে তাদের নির্বাহীদের পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

বাহরাইনেও আগের সংঘাতের আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি অনেক বাসিন্দা। দেশটির ২১ বছর বয়সী এক বাসিন্দা সিএনএনকে জানিয়েছেন, বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শুনলেই এখনো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। বিশেষ করে বাইরে বিস্ফোরণের শব্দ হলে রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ছেন মার্কিন কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যরা
নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি কয়েকটি মার্কিন কূটনৈতিক পরিবারের সদস্যরা নীরবে অঞ্চল ছাড়তে শুরু করেছেন। স্কুলে তাদের সন্তানদের সহপাঠীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

এর আগে গত মার্চে যুদ্ধ চলাকালে নিরাপত্তার কারণে এসব পরিবারের অনেক সদস্যকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা আবারও কর্মস্থলে ফিরে আসেন।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা পাঠানোর খবরও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত
সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও যুদ্ধ এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের কাছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি পর্যালোচনা করছে তেহরান।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পক্ষ থেকে চিকিৎসাসামগ্রী চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এই যোগাযোগের মধ্য দিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

এদিকে কাতারে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন দেশটির একজন কর্মকর্তা। তবে শনিবার অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি।

তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া-ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাকের ধারণা, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে। তার মতে, দুই পক্ষ এমন একটি অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যেখানে সাময়িকভাবে সংঘাত বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। তবে এ জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা থাকা জরুরি।

আলোচনায় দুই পক্ষেরই কঠোর শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের সুযোগ থাকলে ওয়াশিংটন তাতে আগ্রহী। তবে এমন কোনো সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারবে না বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন উদ্বেগের সমাধানকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।

অন্যদিকে ইরানও আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট রয়েছে দেশটির। ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অতীতেও কূটনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যেই তাদের ওপর সামরিক হামলা চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নেওয়া হলেই কেবল আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব।

সূত্র: সিএনএন।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram