

মো. নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: এলপিজি গ্যাসের অবৈধ মজুত, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে চট্টগ্রামে নজরদারি জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর গঠন করা হয়েছে তদারকি কমিটি। আমদানি, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পৌঁছে দিতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। কোথাও গ্যাস মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা অতিরিক্ত দাম আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।
জেলা প্রশাসক জানান, দেশে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র চট্টগ্রাম। দেশের ২১টি মাদার প্ল্যান্টের মধ্যে সাতটি চট্টগ্রামে এবং বাকি ১৪টি মোংলায় অবস্থিত। চট্টগ্রামের প্ল্যান্টগুলোতে কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ এলপিজি আমদানি করছে এবং সেই গ্যাস কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে চট্টগ্রামে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে জেলা প্রশাসন। বৈঠকে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আমদানিকারকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির মাধ্যমে আমদানির পর কতটুকু গ্যাস পরিবেশকদের কাছে যাচ্ছে এবং সেখান থেকে কী পরিমাণ খুচরা বাজারে পৌঁছাচ্ছে, সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আমদানিকারক থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা—সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে, যাতে কোনো পক্ষ অসৎ উদ্দেশ্যে গ্যাস আটকে রেখে বাজারে সংকট তৈরি করতে না পারে।
এদিকে এলপিজির দাম বৃদ্ধি ও মজুতদারির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করেছে। নতুন দাম কার্যকরের পর বিক্রেতারা নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডিলারদের বিরুদ্ধে মূল্য কারসাজির অভিযোগ সম্পর্কে জেলা প্রশাসক বলেন, এলপিজির দাম বাড়ানোর আগে চট্টগ্রামের কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ী জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, কিছু ডিলার কারসাজির মাধ্যমে গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছেন। তবে নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর এ ধরনের আর কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ না থাকলেও বাজার তদারকি অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ বন্ধ করা হয়নি। কোথাও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলপিজির সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসক বলেন, সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় কাতার ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এলপিজি আমদানিতে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তবে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের চাহিদা অপরিবর্তিত রয়েছে।
জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাত থেকে সরবরাহ করা হয় প্রায় ১ শতাংশ। বাকি চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে প্রায় ১৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হলেও এর সুযোগ নিয়ে যাতে কেউ বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে জেলা প্রশাসন। নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা, অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধ এবং মূল্য কারসাজি বন্ধে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
