

হুমায়ুন কবীর রিন্টু, নড়াইল প্রতিনিধি: নড়াইলে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী।
মৃত্যুবার্ষিকী পালনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শুক্রবার ও শনিবার (৯ ও ১০ অক্টোবর) নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সুলতানের শিশুস্বর্গে শিশুদের চিত্রাঙ্কন অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামীণ পরিবেশ-প্রকৃতি, এস এম সুলতানের প্রতিকৃতি, দেশের ইতিহাস-ঐহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয় শিশু-কিশোরদের রঙতুলিতে ফুটে উঠেছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আহসান মাহমুদ রাসেল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিমানেশ বিশ্বাস, এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জি, সহকারী কিউরেটর মেহেদী হাসান রানা, চিত্রশিল্পী নিখিল দাস, চিত্রশিল্পী সাকি প্রমুখ।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মহান এ শিল্পীর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার (১০ অক্টোবর) নড়াইল জেলা প্রশাসন, এসএম সুলতান ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, মাজার জিয়ারত, কোরানখানি, মিলাদ মাহফিল, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী।
শিল্পী সুলতান অসংখ্য দুর্লভ চিত্রকর্মের নিদর্শন রেখে গেছেন। মহান শিল্পী শেখ মুহাম্মদ (এসএম) সুলতান ১৯২৩ সালের ১০ আগষ্ট যশোর জেলার নড়াইল মহাকুমার (বর্তমানে জেলা) মাছিমদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবা এসএম মেছের আলী ছিলেন পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। মা মাজু বিবি ছিলেন গৃহিণী। বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া। শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে সে নামে (লাল মিয়া) ডাকতেন।
তিনি ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা আরম্ভ করেন। স্থানীয় জমিদার রতন বাবু তার আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হন। তাদের সহযোগিতায় প্রতিভাবান শিল্পী এগিয়ে যেতে থাকেন। একাডেমিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য কবি ও চিত্র সমালোচক হাসান শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে আর্ট স্কুলে ভর্তি হন।
শিল্পী তাঁর রঙ-তুলিতে দেশপ্রেম ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। প্রকৃতি, জীব-জন্তু ও শিশুদের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাঁর ছবির প্রধান বিষয় ছিল গ্রাম বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ, মাঠ-ঘাট, কৃষাণ-কৃষাণী, জেলে-জেলেনী, কর্মচঞ্চল জনপদ, কর্মঠ মানুষ, শস্যের জন্য নির্মিতব্য উর্বরা ভূমি ও কর্ষণযন্ত্রাদী, সুগঠিত নারী ও জলাভূমিতে সচল জীবন প্রবাহ।
আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে আরো বেশি আকর্ষনিয় করেছে। তাঁর ছবিতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের তাৎপর্য উঠে এসেছে। কৃষাণ-কৃষাণীকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাঁর বাঁশিতে সুরের যাদু ছিল। তিনি ছিলেন অসাধারণ বংশীবাদক। জনশ্রুতি আছে, তাঁর মায়াবী বাঁশির সুরে জংগলের বিষধর সাপ, বেজি, বিড়াল ছুটে আসত। সকলে একত্রে তাঁর বাশির সুরে নাচতো। সমাজসেবামূলক কর্মকান্ডে তাঁর অবদান অতুলনীয়।
তিনি ১৯৪৩ সালে ‘খোকসার’ আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে কাশ্মীর থেকে সিমলায় এসে প্রথম চিত্র প্রদর্শনী করেন। ১৯৪৮ সালে লাহোরে শিল্পীর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। ১৯৫০ সালে চিত্র শিল্পীদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের জন্য আমেরিকায় গমন করেন। এরপর ইউরোপের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। লন্ডনে বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শণীতে অংশ নেন। অবশেষে ১৯৫৩ সালে এই খ্যাতিমান শিল্পী সুলতান নাড়ির টানে জন্মভূমির মায়ায় নড়াইলে ফিরে আসেন।
তিনি গ্রামের শিশু-কিশোরদের চারুকলার ওপর শিক্ষা দিতে থাকেন। তাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য তিনটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। নন্দনকানন প্রাইমারী স্কুল, নন্দন কানন হাই স্কুল ও নন্দনকানন ফাইন আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৭ সালে নড়াইল পৌরসভার কুড়িগ্রাম ফাইন আর্ট স্কুল ও শিশু স্বর্গ স্থাপন করেন। চির কুমার আধ্যাত্মিক প্রাণ পুরুষ দ্বিতল নৌকা নির্মাণ করেন। নৌকার নাম দেন শিশুস্বর্গ। শিশুস্বর্গ নামের ওই নৌকায় চিত্রা নদীতে ভেসে শিশু-কিশোরদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। প্রকৃতি দেখাতেন ও খেলার ছলে ছবি আঁকা শেখাতেন।
বোহেমিয়ান জীবনে তিনি বর্ণাঢ্য জীবন যাপন করেছেন। তিনি ছিলেন একেবারে নির্লোভ একজন মানুষ। নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন মিনি চিড়িয়াখানা। সারা জীবনে তাঁর কোন সঞ্চয় নেই। যা আয় করতেন তা জীব-জন্তুর পিছনে ব্যয় করতেন। এরপরও তাকে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয়েছে। তাঁর শিল্পকর্ম তাকে দিয়েছে বিশাল মর্যাদা। নড়াইলকে দিয়েছে সম্মান ও পরিচিতি। মহান এ শিল্পীর অনুসারী ও ভক্তরা আজও তাঁর আদর্শকে লালন করে চলেছেন।
