

শহিদ জয়, যশোর: দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্লট সংকট, জলাবদ্ধতা, জরাজীর্ণ সড়ক-ড্রেনেজ, নিরাপত্তাহীনতা ও বিদ্যুৎ সমস্যাসহ নানা সংকটে যশোর বিসিক শিল্পনগরীতে শিল্পের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তাদের চাহিদা থাকলেও খালি প্লট না থাকায় অনেকেই শিল্প স্থাপনের সুযোগ পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে সদর উপজেলার রামনগরে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী বা ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ প্রকল্পও।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোর শহরসংলগ্ন যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুরে ১৯৬২ সালে ৫০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে যশোর বিসিক শিল্পনগরী। দেশের অন্যতম পুরোনো ও বৃহৎ এ শিল্পনগরীটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
যশোর বিসিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিল্পনগরীতে ১২২টি শিল্প ইউনিট চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে হালকা প্রকৌশল, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, কৃষি যন্ত্রপাতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক, কেমিক্যালসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে ৬ হাজার ৯১৮ জনের। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৮৬ জন নারী শ্রমিক। বছরে এখানে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হয়।
তবে শিল্পের এই সম্ভাবনার বিপরীতে বিসিকজুড়ে রয়েছে নানা সংকট। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কয়েক দশক ধরে শিল্পনগরীর অবকাঠামোর তেমন কোনো কার্যকর উন্নয়ন হয়নি। ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোর শহর ও উপশহরের আবাসিক ও অনাবাসিক এলাকায় শতাধিক অটোমোবাইল কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, বাস-ট্রাকের বডি তৈরি, অটোরিকশা ও তিন চাকার যান সংযোজন এবং মেরামতের কাজ হয়। যশোরের বিভিন্ন এলাকায় আরও প্রায় ৩০০ কারখানা রয়েছে। এসব উদ্যোক্তার অনেকে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বিসিকে প্লট চেয়ে আবেদন করলেও জায়গার অভাবে তাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিসিক সূত্র জানায়, শিল্পোদ্যোক্তাদের চাহিদা বিবেচনায় ২০১১ সালের ৮ মে দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রথমে যশোর-নড়াইল সড়কের ফতেপুর এলাকায় ৪০ একর সরকারি জমিতে ‘অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল’ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে সদর উপজেলার রামনগরে ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রায় দেড় দশকেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
যশোর বিসিকের উদ্যোক্তা এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন বলেন, ‘১৯৬২ সালে মাত্র ২৫টি ইউনিটের জন্য যে পানির পাম্প স্থাপন করা হয়েছিল, এখন ১২২টি ইউনিটের জন্যও সেই পুরোনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পানি সরবরাহও স্বাভাবিক নয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আগুন লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করার মতো পর্যাপ্ত পানির উৎস নেই।’
তিনি আরও বলেন, বিসিকের অভ্যন্তরের সড়কগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং কারখানার ভেতরে পানি ঢুকে উৎপাদন ব্যাহত হয়। রাতে সড়কবাতি না থাকায় নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শিল্পনগরীতে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প না থাকায় নিরাপত্তা সংকট আরও বাড়ছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমইউ সিইএ ফুডসের স্বত্বাধিকারী শ্যামল দাস বলেন, ‘উদ্যোক্তারা নিয়মিত সার্ভিস চার্জ দিলেও সে অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না। শিল্পনগরীতে সীমানাপ্রাচীর ও প্রধান ফটক নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এখানে নিজস্ব বৈদ্যুতিক ফিডারও নেই।’
তার ভাষ্য, শিল্পনগরীতে প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা রাস্তা ও ছয় কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এসবের বড় অংশই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক তানভিরুল ইসলাম সোহান বলেন, অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যশোরে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিদ্যমান বিসিককে আধুনিক শিল্পনগরীতে রূপান্তরের পাশাপাশি রামনগরে প্রস্তাবিত ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
চেম্বারের সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, যশোর বিসিকে বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্য উৎপাদিত হলেও উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছেন না। সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদন—দুটিই বাড়বে।
তবে বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যশোর বিসিকের জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এম এনাম আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন বিসিক শিল্পনগরীর দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করতে বড় ধরনের সংস্কার ও আধুনিকায়ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। যশোরের বিদ্যমান বিসিক আধুনিকায়নের পাশাপাশি রামনগরে প্রস্তাবিত ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ স্থাপনের উদ্যোগও বেগবান করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নতুন কয়েক হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্লট সংকট অনেকটাই দূর হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিকল্প ড্রেনেজ ব্যবস্থার একটি খসড়াও প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়েছে। অন্যান্য সমস্যার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, শুধু পরিকল্পনা ও প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিদ্যমান বিসিকের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রস্তাবিত নতুন শিল্প পার্ক বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে একদিকে দীর্ঘদিনের প্লট সংকট কমবে, অন্যদিকে যশোরের সম্ভাবনাময় হালকা প্রকৌশল ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
