

চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচের কাছে নতুন সচিবালয় ও বিধানসভা কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তাব ঘিরে বিরোধিতা ক্রমেই বাড়ছে। পরিবেশবিদ, জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ এবং ক্ষমতাসীন তামিলগা ভেত্রি কড়গমের (টিভিকে) কয়েকজন মিত্রও প্রকল্পের স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আয়তন ২০ লাখ বর্গফুট এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি রুপি। পরিবেশের ওপর প্রভাব, জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকার ভবিষ্যৎ এবং এলাকায় বসবাসকারী মানুষের আবাসনের অধিকার—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মূলত আপত্তি উঠেছে।
পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে চেন্নাই এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বিশাল একটি স্থাপনা নির্মাণের জন্য মেরিনা বিচের মতো উপকূলীয় এলাকা বেছে নেওয়া পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
পরিবেশকর্মী নিত্যানন্দ জয়রামন বলেন, সরকারের প্রস্তাব দেখে মনে হচ্ছে তারা ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা অস্বীকার করার অবস্থানে’ রয়েছে। তার ভাষ্য, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় চেন্নাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সমুদ্রের এত কাছে বড় কমপ্লেক্স নির্মাণ হলে আশপাশের পরিবেশের ওপর চাপ বাড়বে।
তার মতে, শুধু ভবন নির্মাণ নয়, নতুন সড়ক, বাড়তি যানবাহন এবং রাতভর আলোর ব্যবস্থাও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে চেন্নাইয়ের সৈকতে অলিভ রিডলি কচ্ছপের ডিম পাড়ার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশবিদদের আরও আশঙ্কা, প্রকল্পটি মেরিনা এলাকায় পরবর্তী সময়ে আরও অবকাঠামো নির্মাণের পথ তৈরি করতে পারে। এর ফলে আগে স্থগিত থাকা মেরিনা বরাবর উড়াল এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় সড়ক প্রকল্পও ফের আলোচনায় আসতে পারে।
জীবিকা নিয়ে শঙ্কা জেলেদের
জেলে সম্প্রদায়ের কাছে মেরিনা কোনো খালি জমি নয়। এটি তাদের কর্মস্থল, সাগরে যাওয়ার ঐতিহ্যবাহী পথ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের জীবিকার কেন্দ্র।
তাদের আশঙ্কা, বড় সরকারি কমপ্লেক্স নির্মাণ হলে পুলিশি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। সাগরে যাতায়াতসহ ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার কার্যক্রমেও বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
নিত্যানন্দ জয়রামনের অভিযোগ, বাড়তি পুলিশি তৎপরতা ও হয়রানি জেলেদের জীবিকায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। নতুন সড়ক নির্মাণ এবং বসতিগুলোর আশপাশের যাতায়াতপথ পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তার আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প জেলে সম্প্রদায়ের উচ্ছেদের কারণ হতে পারে।
আবাসন নিয়েও প্রশ্ন
প্রস্তাবিত স্থানের আশপাশে বসবাসকারী জেলেদের কাছে নতুন সরকারি কমপ্লেক্সের চেয়ে নিজেদের ঘরের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবিদদের দাবি, যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার আগে এসব মানুষের আবাসন ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
নিত্যানন্দ জয়রামনের মতে, অনেক জেলে পরিবার ইতোমধ্যে ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে এবং ভবিষ্যতে তাদের আবাসন কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মূল্যবান উপকূলীয় জমিতে বড় স্থাপনা নির্মাণের চেয়ে জেলেদের আবাসনের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বাড়ছে রাজনৈতিক বিরোধিতাও
নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাব তামিলনাড়ুতে সরকারি সদর দপ্তরের অবস্থান নিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে এনেছে।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা এর আগে নতুন সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে এম করুণানিধি ওমানদুরার গভর্নমেন্ট এস্টেটে নতুন বিধানসভা ও সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন।
২০১০ সালে উদ্বোধনের পর এটি কিছু সময় রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০১১ সালে জয়ললিতা ক্ষমতায় ফিরে বিধানসভা ও সচিবালয় আবার ফোর্ট সেন্ট জর্জে সরিয়ে নেন। পরে ওমানদুরারের ওই কমপ্লেক্সকে বহু-বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়।
বর্তমান প্রস্তাবটি রাজনৈতিকভাবেও স্পর্শকাতর। কারণ প্রস্তাবিত মেরিনা এলাকার স্থানটি মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের বাসভবনের তুলনামূলক কাছাকাছি।
ক্ষমতাসীন টিভিকের মিত্র ভিসিকে ও এমডিএমকেও প্রকল্পটির বিরোধিতা করেছে। প্রধান বিরোধী দল ডিএমকে করুণানিধির আমলে নির্মিত ওমানদুরার কমপ্লেক্সে আবার বিধানসভা ও সচিবালয় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এআইএডিএমকে বলেছে, চেন্নাইয়ের এমনিতেই যানজটপূর্ণ এলাকায় মেরিনাকে বেছে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
দলটি ১ হাজার ২০০ কোটি রুপির প্রকল্পের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, রাজ্য বড় ঋণের বোঝায় রয়েছে এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কয়েকটি বাস্তবায়নেও সরকার সমস্যায় পড়ছে।
এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্প
প্রকল্পটির বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (ডিপিআর) তৈরি হতে অন্তত তিন মাস সময় লাগতে পারে। ফলে ভবনের নকশা, অবকাঠামোগত প্রয়োজন এবং কতটা জমি ও উপকূলীয় এলাকায় হস্তক্ষেপ করতে হবে—এসব বিষয় এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।
টিভিক সরকারের যুক্তি, ১৭ শতকের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ফোর্ট সেন্ট জর্জ বর্তমান প্রয়োজন ও সক্ষমতার দিক থেকে পুরোনো হয়ে গেছে। ভবিষ্যতের আইনসভা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে তামিলনাড়ুর একটি আধুনিক সমন্বিত কমপ্লেক্স প্রয়োজন।
তবে মেরিনা বিচের প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু সচিবালয় কোথায় হবে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। চেন্নাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলের কতটা অংশ বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করা হবে এবং পরিবেশ, জেলেদের জীবিকা ও উপকূলীয় মানুষের আবাসনের অধিকারকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে—মূল বিতর্ক এখন সেখানেই।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
