

শিব্বির আহমদ রানা, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, দুই পাশে ঘন সবুজের দেয়াল, পাখির কিচিরমিচিরে মুখর চারদিক, দূরে কোথাও বুনো হাতির পদচারণা, স্বচ্ছ লেকের জলে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি, প্রকৃতির এমনই এক অপূর্ব ক্যানভাসের নাম— বাঁশখালী ইকোপার্ক। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, বাঁশখালীর জঙ্গল জলদী ও শীলকূপ ইউনিয়নের মধ্যবর্তী এলাকায় চুনতি অভয়ারণ্যের বিস্তীর্ণ বনভূমিজুড়ে গড়ে উঠেছে এই নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র। এক সময় যা বামেরছড়া ও ডানেরছড়া নামে পরিচিত ছিল।
২০০৪ সালের পর থেকে এটি বাঁশখালী ইকোপার্ক নামে পরিচিতি লাভ করে। বিশাল বনভূমির বুকে গড়ে ওঠা এই পার্ক একসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ছিল। দেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু, সুবিশাল লেক, সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, পাহাড়ি ঝর্ণা, কৃত্রিম লেক, কটেজ এবং অপরূপ সূর্যাস্তের দৃশ্য প্রতিদিন টেনে আনত হাজারো ভ্রমণপিপাসুকে।
পার্কের উঁচু পাহাড়ে দাঁড়ালে চোখে পড়ে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি। দেখা মেলে সবুজ পাহাড়ের সারি। শীতকালে অতিথি পাখির কলতানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এক সময় এখানে ৪৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৮৫ প্রজাতির পাখি, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৭ প্রজাতির উভচর প্রাণীর বিচরণ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বনাঞ্চলের ওপর জনচাপ বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই প্রাণবৈচিত্র্যও অনেকাংশে কমে গেছে। তবে প্রকৃতির রূপ এখনো ম্লান হয়নি, ম্লান হয়েছে কেবল মানুষের যত্নের স্পর্শ।
বর্তমানে পার্কের অনেক স্থাপনাই জরাজীর্ণ। আগের মতো পর্যটকদের বসার জন্য বড় বড় যাত্রীছাউনি নেই। এক সময়ের প্রাণচঞ্চল পিকনিক স্পটগুলো এখন প্রায় পরিত্যক্ত, যেন ভুতুড়ে স্থাপনা। পাহাড়ের বুক চিরে নির্মিত সিঁড়িগুলোর অনেক অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও সিঁড়ির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কঠিন।
মিনি চিড়িয়াখানার খাঁচাগুলো মরিচায় জর্জরিত। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ বামেরছড়া লেকের ওপর নির্মিত দেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতুটিও বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, ডানেরছড়ার এক সময়ের স্বচ্ছ ও নির্মল লেক এখন টোপাপানায় আচ্ছন্ন। পুরোনো স্থাপনাগুলোর অধিকাংশই আজ বিরান দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
২০০৮ সালের ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে ছড়ার বাঁধ ভেঙে পার্কের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তছনছ হয়ে যায় হাইড্রো-ইলেকট্রিক বিদ্যুৎ প্রকল্পও। পরবর্তী ছড়ায় বাঁধ নির্মাণ হলেও এরপর দীর্ঘ সময় ধরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়া এবং অধিকাংশ স্থাপনা সংস্কারহীন থাকায় ধীরে ধীরে কমতে থাকে পর্যটকদের আগমন। পার্কে যাওয়ার সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সংস্কার করা হলেও এখনো প্রায় অর্ধ কিলোমিটার সড়ক ও একটি কালভার্ট সংস্কারের অভাবে দর্শনার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এতে বড় যানবাহন চলাচলেও সৃষ্টি হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা। তবুও সম্ভাবনার দুয়ার এখনো উন্মুক্ত। হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত এই পার্কে রয়েছে অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার। কৃত্রিম লেক, পাহাড়ি ঝর্ণা, দেশি-বিদেশি পাখির আবাস, উন্মুক্ত গ্যালারি, ওয়াচ টাওয়ার, রেস্ট হাউজ এবং মন ছুঁয়ে যাওয়া নৈসর্গিক পরিবেশ এখনো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
পার্কে ঘুরতে আসা পর্যটক মো. নুর মোহাম্মদ বলেন, 'একসময় পরিবার নিয়ে প্রায়ই বাঁশখালী ইকোপার্কে আসতাম। এখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য মুগ্ধ করে, কিন্তু অনেক স্থাপনার বেহাল অবস্থা দেখে খারাপ লাগে। প্রয়োজনীয় সংস্কার হলে এটি আবারও দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।'
আরেক পর্যটক সজীব মিয়া বলেন, 'ইকোপার্কের প্রাকৃতিক পরিবেশ সত্যিই অসাধারণ। তবে ঝুলন্ত সেতু, সিঁড়ি এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর অবস্থা উদ্বেগজনক। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা জরুরি।'
বাঁশখালী ইকোপার্কের কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হক বলেন, 'বাঁশখালী ইকোপার্ক প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের একটি অপার সম্ভাবনাময় কেন্দ্র। পাহাড়, বন, লেক ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। দীর্ঘদিন বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ দল পার্কের সার্বিক উন্নয়ন ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন করেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পার্কটি নতুন রূপে ফিরে আসবে এবং পর্যটকদের কাছে আবারও আগের জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে বলে আমরা আশাবাদী।'
স্থানীয় সচেতন নাগরিক, পর্যটন সংশ্লিষ্ট এবং পরিবেশবিদের মতে, প্রকৃতি এখনো তার রূপ হারায়নি। হারিয়েছে কেবল পরিচর্যার স্পর্শ। পরিকল্পিত উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সংস্কার এবং সামান্য নান্দনিক সংযোজনই ফিরিয়ে আনতে পারে হারানো জৌলুশ। নতুন প্রাণ ফিরে পেতে পারে বাঁশখালী ইকোপার্ক। আবারও মুখর হয়ে উঠতে পারে পাহাড়, লেক আর ঝুলন্ত সেতু। হয়তো আবারও পাখির ডাকে, পর্যটকের কোলাহলে আর শিশুর হাসিতে জেগে উঠবে বাঁশখালীর সবুজ স্বপ্নভূমি– বাঁশখালী ইকোপার্ক।
