

মাসুদ রানা, খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: উন্নতমানের লিচুর বড় উৎপাদন কেন্দ্র দিনাজপুর। সেই দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় চলতি মৌসুমে লিচুর বাজারে দেখা গেছে রেকর্ড দাম। বিশেষ করে জনপ্রিয় চায়না–৩ জাতের লিচু খুচরা বাজারে প্রতি পিস ১০ থেকে ১১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে ১০০টি লিচু কিনতে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন বাগান ও বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার লিচুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বড় আকার, আকর্ষণীয় রং ও সুস্বাদের কারণে চায়না–৩ জাতের লিচুর চাহিদা সবসময়ই বেশি। তবে চলতি মৌসুমে ফলন কম হওয়ায় সরবরাহ সীমিত থাকছে। এতে বাগান পর্যায় থেকেই লিচু বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের শুরুতে কয়েক দফা শিলাবৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে লিচুর গুটি ঝরে পড়েছে। এতে প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায়নি। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামে।
উচ্চমূল্যের কারণে হতাশ সাধারণ ক্রেতারা। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের অতিথি আপ্যায়ন কিংবা শিশুদের প্রিয় মৌসুমি ফল ছিল লিচু। এখন সেই ফল কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
স্থানীয় গৃহিণী কোহিনুর বেগম বলেন, “আগে অতিথি এলে লিচু রাখা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। এখন ১০০ লিচুর দাম এক হাজার টাকা—মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটা বড় বোঝা।”
সীমিত আয়ের অভিভাবক একরামুল হক বাবু বলেন, “বাচ্চারা লিচু খেতে চায়। কিন্তু বাজারে এসে দাম শুনে ফিরে যেতে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সামলে মৌসুমি ফল কেনা এখন বিলাসিতা।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ক্রেতা আল আমিন। তিনি বলেন, “আগে মৌসুমে দু-একশ লিচু কিনে পরিবার নিয়ে খাওয়া যেত। এখন ১০টা লিচু কিনতেই প্রায় ১০০ টাকা লাগে। এভাবে চললে লিচু শুধু ধনীদের ফল হয়েই থাকবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাকুরিজীবী বলেন, “ফলন কমেছে—এটা মানি। কিন্তু প্রতি পিস ১০–১১ টাকা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি। বাজারে লিচু দেখেই এখন আফসোস করতে হয়।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১৪৫ হেক্টর জমিতে ছোট, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে ১৩০টি বাগানে লিচুর চাষ হয়েছে। চায়না–৩ ও মাদ্রাজি জাতের লিচু থেকে ভালো ফলনের আশা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামগ্রিক উৎপাদন কিছুটা কমেছে।
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বাসসকে বলেন, লিচুর মৌসুম শুরুর পর থেকেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর মাঠকর্মীরা বাগান মালিকদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছেন। চৈত্র–বৈশাখে বৃষ্টি এবং জ্যৈষ্ঠ্য মাসে মাঝারি বৃষ্টিপাত হওয়ায় লিচু রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছর সুস্বাদু বেদানা লিচুসহ কয়েকটি জাত বিদেশে রপ্তানির জন্য আগ্রহ দেখা গেছে। আগ্রহী দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী লিচু পাঠানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
