

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে ভারতে আবারও পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মে মাসেই দেশটিতে চতুর্থবারের মতো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হলো।
সোমবার (২৫ মে) কার্যকর হওয়া নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির রাজধানী দিল্লিতে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ রুপি ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ভারতের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির পৃথক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। জ্বালানির এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশটিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিলাররা জানিয়েছেন, নতুন সমন্বয়ে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২ দশমিক ৭১ রুপি এবং পেট্রোলের দাম ২ দশমিক ৬১ রুপি বাড়ানো হয়েছে। গত ১১ দিনের মধ্যে এটি চতুর্থ দফা মূল্যবৃদ্ধি।
সোমবারের নতুন দাম অনুযায়ী, রাজধানী দিল্লিতে এখন প্রতি লিটার পেট্রোল কিনতে গ্রাহকদের ১০২ দশমিক ১২ রুপি গুনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ২০ রুপিতে। এর আগে গত শনিবারও পেট্রোলের দাম ৮৭ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ৯১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল, যার সঙ্গে সিএনজির দামও প্রতি কেজিতে ১ রুপি বাড়িয়ে ৮১ দশমিক ০৯ রুপি করা হয়।
ভারতের তেল বিপণনকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়। এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল কোম্পানি— ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন (আইওসিএল), ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড (বিপিসিএল) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড (এইচপিসিএল) কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে তেল কিনলেও দেশের বাজারে পুরোনো দামেই বিক্রি করে আসছিল। ফলে এই তিন প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে এক হাজার কোটি রুপিরও বেশি লোকসান গুনছিল, যা সামাল দিতেই শেষ পর্যন্ত সরকার দাম বাড়ানোর এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভারতের অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে করা হলো যখন সাধারণ মানুষ আগে থেকেই তীব্র মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছিলেন। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় দেশটিতে পণ্য পরিবহন ব্যয় এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। এর আগের দফার মূল্যবৃদ্ধির পরপরই ভারতে দুধ ও পাউরুটির মতো অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছিল।
গ্রান্ট থরন্টন ভারতের তেল ও গ্যাসবিষয়ক অংশীদার সৌরভ মিত্র এই বিষয়ে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি তেল কোম্পানিগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দেবে, তবে পুরো ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে না।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সৌরভ মিত্র আরও বিশ্লেষণ করে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল হলেও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক ঝুঁকি পুরোপুরি কাটতে আরও বেশ কিছুটা সময় লাগবে। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সম্ভবত ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরেই অবস্থান করবে। এর ওপর ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান দুর্বল হতে থাকায় তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
কোম্পানিগুলোকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে আগামী দিনগুলোতে ধাপে ধাপে আরও কিছু মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারকে তেল কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা এবং সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা— দুই দিকই সমানভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।
সূত্র: আল জাজিরা ও এনডিটিভি
