

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: ঈদ মানেই ত্যাগের গল্প। আর সেই গল্পের বড় অংশজুড়ে থাকে খামারিদের সারা বছরের পরিশ্রম, ঘাম আর অপেক্ষা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি পশু প্রস্তুত করেছেন খামারিরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব পশু যাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বর্তমানে হাটবাজারে বেচাকেনা ভালো, দামেও সন্তুষ্ট খামারিরা। তবুও স্বস্তি নেই-কারণ খো-খাদ্যের বাড়তি খরচ আর শেষ মুর্হুতে তবে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। খামারিদের দাবি, ঈদের আগে ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ ঠেকানো না গেলে এবার লাভবান হবেন না খামারীরা। আর যদিও নায্যমুল্য নিশ্চিতে সহায়তা ও ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
কোরবানির পশুর জন্য বরাবরের মতোই বাড়তি চাহিদা থাকে সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের গরুর। এবার সেই চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে প্রস্তুতি। প্রস্তুত করা হয়েছে গরু, মহিষ, ছাগলসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩ লাখ পশু- যার একটি বড় অংশ যাবে জেলার বাইরে।
কোরবানির বাকি হাতে গোণা আর মাত্র কয়েকদিন। শেষ সময়ে তাই পশুর বাড়তি যত্ন নিচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের খামারিরা। তাদের দাবি, কোনো ধরনের ক্ষতিকর ইনজেকশন বা ভিটামিন ওষুধ ছাড়াই শুধু ঘাস, ভুট্টা, গম ও দানাদার খাবার খাইয়ে পশুগুলো লালন-পালন করা হয়েছে। কোরবানির জন্য পশুগুলোকে প্রস্তুত করতে যত্নের কোনো কমতি রাখা হচ্ছে না।
আর দু-এক দিনের মধ্যেই জেলার বিভিন্ন হাটের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব গরু বিক্রির জন্য নেয়া হবে। তবে কয়েক মাস ধরে গরু লালন-পালনের পর শেষ মুহূর্তে এসে খামারিরা বলছেন, এবার খামার ও হাটে গরুর দাম ভালো থাকায় ঘুরে দাঁড়ানোর আশা রয়েছে।
খামারি আবু বাক্কার জানান, খামারে খামারে এখন যেন তাই ঈদের আগাম ব্যস্ততা। পরিচর্যা, মোটাতাজাকরণ আর ক্রেতাদের আনাগোনায় এখন মুখর জেলার খামারগুলো। শুধু স্থানীয় হাটেই নয়; খামার থেকেও; শুরু হয়েছে বেচাকেনা। ক্রেতাদের আগ্রহ, দামে সন্তুষ্টি-সব মিলিয়ে কিছুটা স্বস্তির হাসি খামারিদের মুখে।
খামারি মোঃ বান্না জানান, প্রতিমন গরু ৩২ তেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারলে তবেই মিলবে কাঙ্খিত লাভ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা-কারণ এবার আরও বেড়েছে গো-খাদ্যের দাম। আর শেষ মুর্হুতে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ এবং অনিশ্চিত বাজার।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গরু আটকের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে খামারিদের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, সারাবছর গরু লালন-পালনের পর শেষ মুহূর্তে ভারতীয় গরু ঢুকলে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা। তবে, সদর উপজেলার নারায়নপুর, ভাখর আলী, শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, মনাকষা ও আলাতুলী ইউনিয়নের তারবিহীন দুর্গম পদ্মার চর এলাকা দিয়ে প্রতিদিনই কিছু গরু বাংলাদেশে আসছে রাতে আঁধারে। আর এসব ভারতীয় গরু সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর হাট, শিবগঞ্জ উপজেলার তর্ক্তিপুর হাট ও নাচোল উপজেলার সোনাইচন্ডি হাটে নামছে বলে একাধিক খামারীরা অভিযোগ করেন। গত সপ্তাহে বিজিবি সীমান্তে ভারতীয় বিশাল বিশাল ১৬টি গরু জব্দ করেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনজের আলম মানিক জানান, বিগত কয়েকবছর ধরে অব্যাহত লোকসানের মাঝে-অনিশ্চয়তায় থাকা এই খাতে এবার বেড়েছে খামারির সংখ্যা, বেড়েছে উৎপাদন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারা ধরে রাখতে প্রয়োজন খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক বাজার ও খামার ব্যবস্থাপনা আর সরকারি সহায়তা।
দেশীয় গরু লালন-পালনকারী খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং কোরবানির আগে যেকোনো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোসা. শারমিন আক্তার জানান, খামারিদের প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। রোগবালাই প্রতিরোধে প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ চলছে। এছাড়া ভারতীয় গরু চোরাচালান বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও বিজিবিকে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরো জানান, এবার জেলায় ১ লাখ ৬৭ হাজার কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে নিবন্ধিত ১৩ হাজার ৫২২টি বাণিজ্যিক খামারে ২ লাখ ২৬ হাজার ৫০০টি গরু লালন-পালন করা হয়েছে। আর এসব কোরবানির পশুর বাজার মূল্য প্রায় ১৬”শ কোটি টাকা।
ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ করে সীমান্তে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সীমান্তে রাতের টহল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ঈদের আগে গরু চোরাচালান বন্ধে কঠোর তৎপরতা রয়েছে।

