

পানি পরিশোধন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ওষুধ উৎপাদন থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব শিল্প খাতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয় সালফিউরিক এসিড। এই পণ্যটি চাহিদার চেয়েও দ্বিগুণ উৎপাদন হচ্ছে দেশেই। এর পরও দেশীয় খাতকে পঙ্গু করে সাফটা সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে উল্টো মানহীন পণ্য আমদানির পথে হাঁটছেন ব্যবসায়ীরা। এতে হুমকির মুখে পড়েছে দেশীয় শিল্প ও জাতীয় অর্থনীতির নিরাপত্তা।
ঝুঁকিতে পড়ছে কর্মসংস্থান এবং এই খাতের ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। আমদানি-রপ্তানির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।
উৎপাদন সক্ষমতা ও চাহিদা : দেশে সালফিউরিক এসিডের দৈনিক উৎপাদন এক হাজার ৫০ মেট্রিক টন। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পণ্যটির দৈনিক চাহিদা সর্বসাকূল্যে ৪৫০ থেকে ৫০০ মেট্রিক টন।
সে হিসাবে দৈনিক চাহিদার চেয়ে উৎপাদনক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি। বর্তমানে দেশের বাজারে পাঁচটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সালফিউরিক এসিড উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ওয়াটা কেমিক্যালসের উৎপাদন ১৮০ মেট্রিক টন, ক্রিসেন্ট কেমিক্যালসের উৎপাদন ২৫০ মেট্রিক টন, স্যালভো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদন ৬০ মেট্রিক টন, এএ রসায়ন শিল্প লিমিটেডের উৎপাদন ৬০ মেট্রিক টন ও টিএসপি কমপ্লেক্সের উৎপাদন ৫০০ মেট্রিক টন।
রপ্তানির সম্ভাবনার পরও আমদানি : দেশে দৈনিক চাহিদার চেয়েও অতিরিক্ত উৎপাদন হলেও রপ্তানির বিপরীতে উল্টো আমদানি হচ্ছে পণ্যটি।
দেশের বিপণনকারী শিল্পসহ রপ্তানীমুখী শিল্পে সালফিউরিক এসিডের ব্যবহার থাকায় রপ্তানি করা সম্ভব। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ খাত থেকে বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ সালফিউরিক এসিড উৎপাদনকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এইচ এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে আরো বেশি। বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ হলে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মতো আমদানি খরচ বাঁচবে।’
ঝুঁকিতে পড়বে শিল্প খাত : দেশের বাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম হলেও সাফটা সুবিধায় কম শুল্কে সালফিউরিক এসিড স্থানীয় বাজারে আসছে।
এতে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ‘রুল অব অরিইটি’ অনুসরণ না করায় অন্য দেশের পণ্য সাফটা সুবিধায় দেশে আসছে। এতে মানহীন সালফিউরিক এসিড ডাম্পিংয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের শিল্প ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবেশী ভারত থেকে মানহীন পণ্যটি আমদানির কারণে দেশীয় শিল্প ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশীয় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে মানহীন পণ্য উচ্চদামে আমদানি করতে হবে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ তাদের রপ্তানি নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনলে দেশীয় শিল্প খাতে নেমে আসবে শঙ্কার মেঘ।
হুমকির মুখে আড়াই লাখ কর্মসংস্থান : দেশের নানামুখী শিল্পের উৎপাদনে অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয় এই সালফিউরিক এসিড। দেশে মোট পাঁচটি কারখানায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ এই পেশায় জড়িত। এইচ এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় সংকটটা বেড়েছে। আমাদের উৎপাদিত এসিড উচ্চমানের। কিন্তু ভারত থেকে আমদানি করা সালফিউরিক এসিডের মান ভালো না। যে কারণে তা কম দামে বাজারে প্রবেশ করছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখের মতো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে।’
প্রয়োজন বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ : বাংলাদেশ সালফিউরিক এসিড উৎপাদনকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও জাতীয় অর্থনীতির নিরাপত্তার জন্য সালফিউরিক এসিড আমদানিতে আমদানি শুল্ক-কর বহাল রেখে সম্পূরক শুল্ক ১০০ শতাংশ করা উচিত। সেই সঙ্গে কঠোরভাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অন্যদেশে রপ্তানি করতে আমাদের নানা বাধায় পড়তে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমদানি একেবারে সহজ। মাত্র ৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে ভারত থেকে মানহীন এসিড প্রবেশ করে।’

