ঢাকা
৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
দুপুর ১:১৪
logo
প্রকাশিত : এপ্রিল ৩০, ২০২৬

৩ মাসে ৮৫৪ খুন, ঢাকায় ৬১

রাজধানীতে কিছুদিন পর পরই ঘটছে প্রকশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা। এতে আতঙ্কিত হয়েপড়ছে নগরবাসী। আন্ডারওয়ার্ল্ডেও নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর কারাগারে থাকা পাঁচ শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে আসার পর রাজধানীতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চাঁদাবাজি ও খুনাখুনিতে জড়াচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।

এ ছাড়া রাজধানীর বাইরেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেই প্রমাণ মিলছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছিল তিন হাজার ২৩টি। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৪৪২টিতে। আর গত বছর তা তিন হাজার ৭৮৬টিতে পৌঁছায়।

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি থেকে মার্চ) রাজধানীতে ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চে ২৪টি খুনের ঘটনা ঘটে। এপ্রিলের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেরুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে ৩১৭টি হত্যা মামলা হয়। চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করা হয়। এই ক্রমবর্ধমান খুনের ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক দশাকেই তুলে ধরছে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, টিটন গত মঙ্গলবার রাতে আজিমপুরের দিক থেকে নিউমার্কেটের দিকে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলেন।

এ সময় পেছন দিক থেকে মাস্ক পরা এক সন্ত্রাসী গিয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে প্রথমে দুটি গুলি ছোড়ে। পরে আবার দৌড়ে তাঁর কাছে গিয়ে আরো দুটি গুলি করে। এতে তিনি পড়ে যান। পরে আবার তাঁর সামনে গিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। এ সময় লোকজন চিৎকার দিলে ওই দুর্বৃত্ত আরেকটি ফাঁকা গুলি করে দৌড়ে গিয়ে অপেক্ষায় থাকা সঙ্গীর মোটরসাইকেলের পেছনে বসে। এরপর তারা সামনের দিকে চলে যায়। এ সময় রাস্তা দিয়ে অনেক মানুষ চলাচল করছিল।

প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা দেখে তারা দ্বিগ্বিদিক দৌড়াতে শুরু করে। একই রকম দৃশ্য দেখা যায় গত বছর ১০ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সামনে। সেখানে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সন্ত্রাসী তারিক সাইদ মামুনকে। সেখানে দুজন মাস্ক পরা ব্যক্তি খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। কয়েক শ মানুষের মধ্য থেকে মামুনের পিছু নিয়ে গুলি করতে থাকে সন্ত্রাসীরা। এমন ভয়ংকর ঘটনার পর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সিটি পেট্রল পাম্প ও বিজি প্রেসের মাঝামাঝি এলাকার মূল সড়কে যানজটে আটকে ছিলেন সেই মামুন। ওই দিন ১০-১২ জনের একটি দল প্রকাশ্যে ভিড়ের মধ্যে মামুনের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি শুরু করে। একপর্যায়ে মামুন গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন তাঁকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। মামুন তখন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে তাঁকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলিতে ভুবন চন্দ্র শীল নামে একজন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। এভাবেই রাজধানীতে ঘটে চলেছে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড।

গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীকেও রাজধানীর বুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। অনেক হত্যাকারী আবার নির্বিঘ্নে দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ারও সুযোগ পাচ্ছে। ওসমান হাদীর দুই হত্যাকারী ভারতে গ্রেপ্তারের পর এ চিত্র সামনে এসেছে।

পুলিশ অবশ্য বলছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ জন্য পুলিশের নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ সজাগ রয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনাগুলো সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে ঘটছে, যেখানে সাধারণ মানুষের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘সম্প্রতি দেশে গুলি করে হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব ঘটনায় হতাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু মানুষ যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তখন তারা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গুলির ঘটনা শুধু অপরাধ নয়, এটি সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ায়। তাই দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।’

সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের কারাগারগুলো থেকে অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে যান। এদের মধ্যে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুর নাম উল্লেখযোগ্য। জেল থেকে বেরিয়েই তারা পুরনো আধিপত্য ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। জেল থেকে যারা বেরিয়ে এসেছে তাদের মধ্যে গত মঙ্গলবার রাজধানীতে খুন হলো টিটন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, হাজারীবাগ ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় আলোচিত সন্ত্রাসীদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমনের মধ্যে চরম বিরোধ চলছে। গত জানুযারিতে এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় ইমনের নাম সামনে আসায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ নতুন করে আলোচনায় আসে। পুলিশ জানায়, ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত এজাজ বিন আলম গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। দুবাই, থাইল্যান্ড, ভারত ও সুইডেনে বসে তারা ঢাকার ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ফোনে হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। কখনো কখনো সন্ত্রাসীদের সহযোগীরা সরাসরি গিয়ে কোনো ব্যক্তির হাতে ফোন ধরিয়ে দিচ্ছে এবং বলা হচ্ছে, ‘বড় ভাই কথা বলবেন।’ এর পরই শুরু হয় পিলে চমকানো হুমকি। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে সরাসরি খুনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

গত জানুয়ারিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যার পেছনেও এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর হাত রয়েছে বলে জানা যায়। ওই সন্ত্রাসী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় সুইডেনে পাড়ি জমান এবং সেখান থেকেই ঢাকার অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার বিরুদ্ধে ৯টি হত্যাসহ ২২টি মামলা রয়েছে।

জানা যায়, রাজধানীর অপরাধ জগৎ এখন কয়েক ভাগে বিভক্ত। মিরপুর, পল্লবী, ভাসানটেক ও কাফরুল এলাকায় মফিজুর রহমান মামুন, শাহাদাত সাধু, কিলার আব্বাস ও কিলার ইব্রাহিমের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। গত ১৮ এপ্রিল কাফরুলে একটি গার্মেন্টসে ঢুকে সন্ত্রাসীদের চাঁদা দাবি ও গুলি করার ঘটনায় স্থানীয় ‘ফোর স্টার’ গ্রুপের নাম উঠে আসে, যারা দেশের বাইরে থাকা সন্ত্রাসীদের নির্দেশে কাজ করছে।

ফার্মগেট ও কাওরান বাজার এলাকায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের (ওয়াসা, তিতাস, খামারবাড়ি, পানি উন্নয়ন বোর্ড) টেন্ডার বাণিজ্যের দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বাদশাহ, আহাদ, সিদ্দিক ও রবিনরা। ধানমণ্ডি, নিউ মার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ইব্রাহিম, কিলার জসিম, লেদু হাসান ও তপন সানিদের মতো ক্যাডাররা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সমপ্রতি জামিনে মুক্ত হওয়া ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কিলার জসিম এই এলাকায় প্রভাব বিস্তারে অন্যতম ভূমিকা রাখছেন বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমানে মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকা অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গত ১২ এবং ১৫ এপ্রিল ইমন হোসেন ও আসাদুল হক নামের দুই যুবককে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এখানকার কিশোর গ্যাং ও পেশাদার অপরাধীদের পেছনে বড় ভাইদের ছত্রচ্ছায়া থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। আধিপত্য বিস্তার, ফুটপাত দখল ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মূলত এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram