

কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আলাদা করেছে নাফ নদী। এই নদীর মোহনা এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ সাগরে মাছ ধরেই মূলত জীবিকা নির্বাহ করেন বাংলাদেশি জেলেরা। কিন্তু একের পর এক জেলেকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আতঙ্কে জেলেরা।
স্থানীয়রা জানান, গত ৯ মাসে ৩২২ জনের বেশি জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। এতে অনেকেই সাগরে মাছ ধরতে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার ফিরে আসা জেলেরা জানিয়েছে, তাদের ওপর হওয়া অমানুষিক নির্যাতনের কথা। এমনকি দেওয়া হতো না পর্যাপ্ত খাবার। তাদের অভিযোগ, দেশের জলসীমার ভেতরে থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই অপহরণের শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় জেলেরা জানান, বিজিবি ও কোস্টগার্ড থেকে মিয়ানমার সীমান্তে না যেতে আমাদেরকে জানিয়েছে। তবে কেউ ওদিকে গেলে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। সীমান্তের এপারে থাকলেই নিয়ে যেতে পারে না। আক্রমণ বেশি করে বলেই কোস্টগার্ড আর বিজিবি থাকে। তাই নিতে পারে না, না হলে এখান থেকেও নিয়ে যেতো।
জানা গেছে, সাধারণত জেলেরা যখন নাফ নদীর মোহনা বা সাগরের কাছাকাছি মাছ ধরতে যান তখন স্পিডবোটে এসে অস্ত্রের মুখে তাদের ঘিরে ফেলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। নাফ নদীর নিরাপত্তার দায়িত্বে কোস্টগার্ড। তাই কোস্টগার্ড নিয়মিত টহলও পরিচালনা করে থাকে। তারপরও বাংলাদেশি জেলেরা মিয়ানমার সীমান্তে অংশে গিয়ে আরাকান আর্মিদের হাতে আটক কিংবা বন্দী হন।
স্থানীয়রা জানান, গত দুই বছরে অন্তত ৫০০ জেলেকে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে গেছে। আর গত ৯ মাসেই ৩২২ জনেরও বেশি জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও শতাধিক জেলে এখনও মিয়ানমারে বন্দী অবস্থায় রয়েছেন বলে ধারণা।
একজন জেলে বলেন, মায়ানমারের পাশে একটা খাড়ি ছিল, আগে আমরা সেটা ব্যবহার করতাম। এখন ওই পথে গেলে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করে, পরে খাবারও দেয় না, বরং কাজ করায়।
আরেকজনের ভাষ্যমতে, গত ২১ রমজানে সেখানে তিনি ধরা পড়েন। জানান, ট্রলারে প্রায় ২ লাখ টাকার মাছ ছিল, সব নিয়ে গেছে। খাবার-দাবার, ডিজেলসহ আরও অনেক কিছু নিয়ে নেয়। আমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ আটকে রেখে পরে ছেড়ে দেয়।
নাফ নদীর সীমান্ত এলাকায় জেলেদের নিরাপত্তায় নিয়মিত টহল কার্যক্রম চালাচ্ছে কোস্টগার্ড। অপহরণ ঠেকাতে বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। তারপরও আরাকান আর্মি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে অপহৃতদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাছ বেশি পাবেন এমন আশায় জেলেরা মায়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়লে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানায় কোস্টগার্ড।
এ বিষয়ে টেকনাফের স্টেশন কমান্ডার লে. কমান্ডার শাহীন আলম বলেন, স্থানীয় জেলেরা বেশি মাছ ধরার আশায় নাফ নদীর সীমান্ত অতিক্রম করে মায়ানমারের সীমানায় চলে যায়। সেখানে গেলে অনেক সময় আরাকান আর্মি তাদের আটক করে। পরে আমরা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এসব জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি।
এদিকে, কোথায় মাছ ধরা ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো জানানো এবং সীমানা রেখা অতিক্রম না করতে সতর্ক করা কিংবা লিফলেট বিতরণ মাইকিং এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে জেলেদের সতর্ক করা হচ্ছে।

