

অতি সংক্রামক রোগ হামের ‘উচ্চঝুঁকিতে’ সারা দেশ। এ পর্যন্ত ৬১ জেলায় ছড়িয়েছে রোগটি। গত দেড় মাসে এই রোগে আড়াই শর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে মহামারি ব্যবস্থাপনার মৌলিক ধাপগুলো খুব দ্রুত কার্যকর করা জরুরি।
অথচ সরকারি পর্যায়ে তেমন জোরালো কোনো তৎপরতা এখনো নেই। বরং স্বাভাবিক নিয়মে রোগটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। হামে মৃত্যুর ঘটনা না কমে বরং বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, গত দেড় মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম ছড়িয়েছে ৬১ জেলায়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৩৩ হাজার ৩৮৬ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ৪৪২ শিশু।
হামের বর্তমান এ পরিস্থিতিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা—ডব্লিউএইচও জাতীয়ভাবে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ বলেও মূল্যায়ন করছে। একই সঙ্গে টিকার তীব্র ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের মহামারি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অতি সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করে, তা এক অর্থে মহামারিই। এই সময়ে সরকারের উচিত সংকট মোকাবেলায় জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা।
বাস্তবে দেখা গেছে, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু করেছে। এ ছাড়া ডেডিকেটেড ওয়ার্ড ঘোষণা করেছে ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে।
মহামারি মোকাবেলায় মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডেঙ্গু বা কভিডের মতো বিজ্ঞানভিত্তিক ক্লিনিক্যাল প্রটোকল তৈরি, যা অনুসরণ করে উপজেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে এক অভিন্ন চিকিৎসা প্রদান করা হবে। সরকার এখন পর্যন্ত তা করেনি। এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীদের হাম ব্যবস্থাপনায় কোনো বিশেষ ওরিয়েন্টেশন বা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।
অন্য ধাপগুলোর মধ্যে রয়েছে জনস্বাস্থ্য নজরদারির মাধ্যমে রোগের বিস্তার ও ধরন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিধি-নিষেধ আরোপ করা। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করতে ব্যাপক পরীক্ষা, সংক্রমিতদের আইসোলেশন এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা। হাসপাতালে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করা।
এর বাইরে অতি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ হলো ‘ডেথ রিভিউ’ বা মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ। যার মাধ্যমে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা নির্ণয় করাও সহজ হয়। একই সঙ্গে মৃত্যু কমানো যায়। এসব বাস্তবায়ন করা হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতিকে উচ্চঝুঁকির আখ্যা দেওয়ার পর এ নিয়ে সরকারের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা উচিত ছিল। তাহলে একদিকে যেমন সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেত, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো যেত।’
কিটস্বল্পতায় ব্যাহত পরীক্ষা : কিটস্বল্পতার কারণে হাম শনাক্তের পরীক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে কেবল রাজধানীর মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরিতেই হামের পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষার এই স্বল্পতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান জানান, তাঁদের ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন তিন-চার শ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। তবে কিটস্বল্পতার কারণে বর্তমানে গড়ে মাত্র ১২০ বা কিছু বেশি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, হাম পরীক্ষার কিট সরবরাহ করে ডব্লিউএইচও। একটি কিট দিয়ে প্রায় ৯০ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত ল্যাবরেটরিতে ৫০টিরও কম কিট মজুদ ছিল, যা দিয়ে সীমিতসংখ্যক পরীক্ষা চালানো সম্ভব।
এদিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছু কিট এসে পৌঁছালেও কাগজপত্রের জটিলতায় সেগুলো এখনো খালাস করা যায়নি। ফলে জরুরি এই সরঞ্জাম ব্যবহারের বাইরে পড়ে আছে।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, পর্যাপ্ত পরীক্ষা না হওয়ায় তাদের বড় একটি অংশ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ থেকে ১৮ এপ্রিল—এই আট দিনে ৯৬৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৬৪১টি নমুনায় হাম শনাক্ত হয়েছে, যা মোট পরীক্ষার ৬৬.৪ শতাংশ।
সংক্রমণ হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ার কারণ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। ২০০০ সালে হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে কাভারেজ ছিল ১২০ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ।
সারা দেশে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মূলত জানুয়ারি থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন ও মার্চ মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক ভ্রমণ করেছে মানুষ। এতে সংক্রমণ সহজে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের লক্ষণ চিহ্ন প্রকাশ পেতে তিন দিন সময় লাগে। এই সময় আক্রান্ত শিশু ১৮ জনের মধ্যে হাম ছড়িয়ে দেয়।
এত মৃত্যুর কারণ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, ঢাকার হাম নিয়ে ভর্তি রোগী ৯ হাজার ৮৭৭ জন। মৃত্যু ২৬৪ শিশুর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশে শিশু হাসপাতাল ও ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড হাসপাতালে। এ পর্যন্ত ভর্তি রোগী ছয় হাজার ৪০০। মৃত্যু ৬৬ জনের।
মারা যাওয়া এসব শিশুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি তিনজনে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ৪০ শতাংশ।
বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম। ৫০ শতাংশের বয়স ৭-১০ মাস। এক বছরের বেশি বয়সে মৃত্যু হয়েছে ৩২ শতাংশ।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, বেশির ভাগ শিশু ঢাকার বাইরে থেকে আসা এবং বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে খারাপ পরিস্থিতি নিয়ে এখানে এসে ভর্তি হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি শিশু হামের সঙ্গে মারাত্মক নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। ৯০ শতাংশ শিশু হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় জটিল অবস্থায় পৌঁছায়। এর বাইরে একাধিক জটিলতা হিসেবে ৩৩ শতাংশের ম্যানিনগোঅ্যানকেফালাইটস ও ২২ শতাংশ সেপটিসেমিয়া দেখা দেয়।
ডিএনসিসি হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল ডা. লতিফা রহমান বলেন, হাম আক্রান্ত এসব রোগীর প্রথম সমস্যা হলো অপুষ্টি। এর বাইরে কোনো কোনো ক্রনিক ডিজিজ শিশুদের জটিল পরিস্থিতি তৈরির জন্য দায়ী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন চিকিৎসক জানান, বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর পরিস্থিতি আগে থেকেই ছিল। কিন্তু নিউমোনিয়ার মৃত্যুকে কমানোর বিষয়ে বড় উদ্যোগ অনেক বছর ধরেই নেওয়া হয়নি। এর চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব রোগীকে যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় জোগাড়যন্ত্র নেই।
দেশে এক দশকে হামে মৃত্যু : দেশে হামের সার্ভিল্যান্স বা নিরীক্ষণ হয় ডব্লিউএইচওর সহযোগিতায়। সমপ্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পক্ষ থেকে এ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ডব্লিউএইচওর দেওয়া বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে হামে আক্রান্ত ৯ হাজার ৭৪৩ রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৯৩৪, যা ওই সময়ের বড় প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত দেয়। এরপর ২০০৬ সালে তা নেমে আসে ছয় হাজার ১৯২তে। অর্থাৎ ২০০৪ থেকে ২০০৫-এর ভয়াবহ অবস্থার পর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত কমে আসে।
এর পরও বাংলাদেশ হামকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ডব্লিউএইচওর পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১১ সালে দেশে হাম রোগীর সংখ্যা আবার লাফ দিয়ে পাঁচ হাজার ৬২৫ জনে উঠে আসে। ২০১২ সালে তা এক হাজার ৯৮৬ জনে নেমে আসে। ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে হাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল। পর্যালোচনা বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৬ সময়ে টিকাদান বাড়লেও ২০১৬ সালে আবার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গুরুত্ব পাচ্ছে না : হাম মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ খুব একটা আমলে নিচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ১২ এপ্রিলের যৌথ সভা থেকে বিশেষজ্ঞরা একটি বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনসহ বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেন। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হতে দেখা যাচ্ছে না বলে জানান জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো নিয়মিত টিকা ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরও সময়মতো ‘আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশন কমিটি’ গঠন না করাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন জ্যেষ্ঠ এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলেন, সরকার শুধু টিকা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। টিকাদান কর্মসূচিতে মাঠ পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত প্রচেষ্টার ব্যাপক অভাব। এ বিষয়ে বিশেজ্ঞদের পরামর্শ মানা হচ্ছে না। সরকার যথাযথ মাইক্রো-প্ল্যানিং বা জেলাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই কেবল টিকা আমদানির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। টিকার গুণমান বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কোল্ড চেইন ঠিকমতো মেনটেইন করা হচ্ছে না। এ ছাড়া হাম পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত টেস্টিং কিটের অভাব, যা রোগ শনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কোনো প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়নি।
আবু জামিল ফয়সাল বলেন, সবচেয়ে বড় কথা সরকার মহামারি বা ‘আউটব্রেক’ শব্দটি ব্যবহার করতে ভয় পেয়েছে, যাতে মানুষ আতঙ্কিত না হয়; কিন্তু এর ফলে রোগ প্রতিরোধে সামাজিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়নি।
সম্প্রতি দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। দাবিগুলো হলো আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। টিকা নিয়ে সমাজে বিদ্যমান ভুল ধারণা আর গুজব মোকাবেলায় কার্যকর জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করা, শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা।
সুত্র: কালের কণ্ঠ

