

পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: ইটভাটার কালো ধোঁয়া আর দমবন্ধ করা তাপে দিঘলকান্দী গ্রামে যেন নিঃশব্দে শুকিয়ে যাচ্ছে সবুজ। আম-কলাসহ মৌসুমি ফসলের উপর নেমে এসেছে অদৃশ্য বিপর্যয়। কৃষকের ঘামে ফলানো জমি আজ ধূসর ছাইয়ের ছোঁয়ায় বিপন্ন।
পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের এই গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, ‘মেসার্স এস বি এক্স ইউ টাটা’ নামে একটি ইটভাটাকে ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে স্থানীয়দের ক্ষোভ। অভিযোগ, ভাটার তীব্র তাপ আর কালো ধোঁয়ার দাপটে আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমির ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে এই মৌসুমে আম ও কলার বাগানে ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় কৃষক মাহি জানালেন, “আমার নিজেরই প্রায় দুই বিঘা কলার গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু আমি নই, আরও অনেকের একই অবস্থা।” তাঁর কথায় মিশে ছিল হতাশা আর ক্ষোভ। একই সুর শোনা গেল মেহেদী হাসান স্বপ্নের গলাতেও। তিনি বলেন, “চার বিঘা জমিতে আমের বাগান ছিল। আগেও সমস্যা হয়েছিল, কিছু জরিমানা দিয়েছিল ভাটা। পরে গাছ কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছি। এখন যেগুলো আছে, সেগুলোর আম কালো হয়ে ঝরে পড়ছে।”
কৃষি দপ্তরের স্থানীয় সূত্রও ক্ষতির চিত্রকে উড়িয়ে দিচ্ছে না। বানেশ্বর ব্লকের কৃষি কর্মকর্তা মোসাঃ শাহেদা খাতুন জানান, “ভাটার প্রভাবে ইতিমধ্যেই কিছু আমবাগান কেটে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৫০ বিঘা কলার বাগানের মধ্যে ১৫-১৬ বিঘায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।” তাঁর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত।

সমস্যা শুধু ফসলেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাটার কাছেই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ধোঁয়া আর তাপের কারণে সেখানে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ। অভিভাবকদের দাবি, শিশুদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গ্রামবাসীদের আরও অভিযোগ, বর্ষা এলেই ভাটার পাশের রাস্তা কাদা আর দূষণে অচল হয়ে পড়ে। ফলে দৈনন্দিন যাতায়াতেও ভোগান্তি চরমে ওঠে।
যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভাটার মালিক শাহাবুদ্দিন। তাঁর দাবি, “কোনও কৃষক সরাসরি আমার কাছে অভিযোগ করেননি। অন্যের মুখে শুনেছি অভিযোগের কথা।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। আগে আংশিক ক্ষতিপূরণ মিললেও সমস্যার মূল রয়ে গেছে অমীমাংসিত। প্রায় ২০ জন কৃষক মিলে ইতিমধ্যেই ইউএনও ও কৃষি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
গ্রামবাসীদের একটাই প্রশ্ন, আর কতদিন এই ধোঁয়া-তাপে পুড়বে তাঁদের জমি? তাঁদের দাবি, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে ভাটার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনে স্থানান্তর এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক। না হলে দিঘলকান্দীর সবুজ শীঘ্রই শুধুই স্মৃতি হয়ে থাকবে।

