ঢাকা
৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ৬:৩০
logo
প্রকাশিত : মার্চ ১৫, ২০২৬

অবসরের টাকা পেতে পদে পদে হয়রানি

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলেও অবসরের টাকা পেতে পদে পদে হয়রানির মধ্যে পড়ছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন এমনিতেই কম, তাঁদের পেনশন সুবিধাও নেই, ফলে শেষ জীবনে অবসরের এককালীন টাকাই তাঁদের ভরসার জায়গা। কিন্তু আবেদনের চার বছর পরও অবসরের টাকা পাচ্ছেন না শিক্ষক-কর্মচারীরা। এমনকি টাকা না পেয়ে অনেক শিক্ষক রোগ-শোকে ভুগে মারাও যাচ্ছেন।

দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও আগের সরকার এদিকে ভ্রুক্ষেপই করেনি।সম্প্রতি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় শিক্ষকরা আশা করছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক থাকায় তাঁদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে সরকার বিশেষ নজর দেবে। এই খাতে প্রয়োজনে আগামী বাজেটেই বিশেষ বরাদ্দ রাখবেন। আর ভবিষ্যতেও যেন সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য প্রতিবছর বাজেটেই বরাদ্দ রাখবেন।

সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের জন্য রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট। শিক্ষকদের প্রতি মাসের মূল বেতন থেকে অবসর বোর্ডে কেটে নেওয়া হয় ৬ শতাংশ টাকা ও কল্যাণ ট্রাস্টে কেটে নেওয়া হয় ৪ শতাংশ টাকা। কিন্তু বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থে পেনশনের পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। আর সরকারের পক্ষ থেকে

প্রতিবছর বাজেটে এবং চাহিদামতো এককালীন থোক বরাদ্দ না দেওয়ায় প্রায় এক লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদনের স্তূপ জমে আছে।

এর মধ্যে অবসর বোর্ডে আবেদন জমা আছে প্রায় ৬৫ হাজার ও কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন জমা আছে প্রায় ৪৫ হাজার।ফরিদপুরের সদর উপজেলার একটি স্কুলের শিক্ষক আবদুল হাই বলেন, ‘তিন বছর আগে অবসরে গেছি। ছেলেমেয়েরাও সেভাবে সচ্ছল নয়। নানা রোগ ভেতরে বাসা বেঁধেছে। মনে করেছিলাম অবসরের পুরো টাকাটা পেলে একটু ভালো করে চিকিৎসা করাব, ছেলের একটা কাজের ব্যবস্থা করব, কিন্তু কবে টাকা পাব, তা বলতে পারছে না কেউ।

অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া ৬ শতাংশ অর্থে প্রতি মাসে জমা হয় ৭০ কোটি টাকা। আর বোর্ডের এফডিআর থেকে আসে তিন কোটি টাকা। প্রতি মাসে মোট আয় হয় ৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে যতসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে যান, তাঁদের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে প্রয়োজন হয় ১১৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি থাকে ৪২ কোটি টাকা। এভাবে আবেদন জমতে জমতে চার বছরেরও বেশি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এতে একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার চার বছরেরও বেশি সময় পরে টাকা পাচ্ছেন।

কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্র জানায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন থেকে পাওয়া ৪ শতাংশ অর্থ ফান্ডে প্রতি মাসে জমা হয় ৫০ কোটি টাকা। আর ট্রাস্টের এফডিআর থেকে মাসে পাওয়া যায় দুই কোটি টাকা। ফলে সব মিলিয়ে মাসে আয় হয় ৫২ কোটি টাকা। অথচ প্রতি মাসে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ৬৫ কোটি টাকা। এতে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যায় ১৩ কোটি টাকা।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির সেখ বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই দীর্ঘসূত্রতা দীর্ঘদিনের। কারণ শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে আমরা যে অর্থ পাই, আর যে টাকা তাঁদের দিতে হয়, এতে বিশাল ব্যবধান। ফলে দীর্ঘ জটের সৃষ্টি হয়েছে। আবার শিক্ষকদের আবেদনের তথ্যেও অনেক গরমিল থাকে। এ কারণেও অনেকের টাকা পেতে দেরি হয়। আসলে অবসরের টাকা সঙ্গে সঙ্গে দিতে হলে সরকারকে এ খাতে এককালীন বরাদ্দ দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবছরের বাজেটেই বরাদ্দ রাখতে হবে। আমরা মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়গুলো অবহিত করেছি। আশা করছি, তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী, তারা এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেবে।’

সূত্র জানায়, অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে পৃথকভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা পরিশোধ করা হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে যেসব শিক্ষক আবেদন করেছিলেন, তাঁরা এখন অবসর বোর্ডের টাকা পেয়েছেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে যাঁরা কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন করেছিলেন, তাঁরা এখন তাঁদের টাকা পাচ্ছেন। এখন আবার পরবর্তী তিন মাসের আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর-কল্যাণের টাকা পরিশোধে কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব শিক্ষকের পাওনা একবারে পরিশোধ করতে সরকারের কাছ থেকে এককালীন সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ প্রয়োজন। আর প্রতিবছরে বাজেটে মাত্র ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। কিন্তু অবহেলিত এসব শিক্ষকের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে আগের সরকারের তেমন আগ্রহ ছিল না। এমনকি সব কিছু জেনেশুনে চুপ ছিল শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়।

জানা যায়, অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের অফিস শুরু থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল পলাশীর ব্যানবেইস ভবনে। দীর্ঘদিন ব্যানবেইস ভবন ঘিরে হাহাকার ছিল বেসরকারি শিক্ষকদের। গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইস্কাটনের প্রবাসী কল্যাণ ভবনে এই অফিস দুটি স্থানান্তর করা হয়। শিক্ষকরা আশা করছেন, অফিস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের পাওনা অবসরের টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও গতি ফেরাবে সরকার।

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাঁরা অবসরের টাকা পেতেও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। আমরা আশা করব, নতুন সরকার শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে খুব দ্রুত উদ্যোগ নেবেন।’

শিক্ষকদের এই নেতা বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষকদের সমস্যা বেসরকারি শিক্ষকরাই বেশি বুঝবেন। এই যে অবসর বোর্ড, কল্যাণ ট্রাস্ট হয়েছে, শিক্ষকরা অবসরের টাকা পাচ্ছেন, এটা বেসরকারি শিক্ষকদের আন্দোলনের ফসল। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে একটা অধ্যাদেশ জারি করে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি শিক্ষকদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের হাতে দিয়ে যায়। এটা বেসরকারি শিক্ষকসমাজ মেনে নেবে না। কারণ সরকারি শিক্ষকরা বেসরকারি শিক্ষকদের দুঃখ-কষ্ট বুঝবেন না। তাই আমরা চাই, এই অধ্যাদেশ বাতিল করে এই দুই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি শিক্ষকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। নয়তো আবার বেসরকারি শিক্ষক সমাজ আন্দোলনে নামবে।’

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram