

হামাসের হামলা ইসরায়েলকে কাঁপিয়ে দেওয়ার ও গাজায় চলমান গণহত্যা যুদ্ধ শুরুর পর তিন বছর কেটে গেছে। একটি অজেয় শক্তি হিসেবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যে ভাবমূর্তি ছিল, তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। এর জবাবে ইসরায়েল ইসরায়েল পারমাণবিক বোমা ছাড়া তাদের সব সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে মৃত্যু ও ধ্বংসের এক নজিরবিহীন অভিযানে তাদের সব পশ্চিমা মিত্রকে একাট্টা করেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কেবল সামরিক ঘাঁটি ও ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন (হামাস) যোদ্ধাদেরই লক্ষ্যবস্তু করেনি, বরং গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে বেসামরিক জনগণের ওপর প্রতিশোধের লক্ষ্য নিয়েছে। এখন পর্যন্ত তারা ৭৪ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা ও ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে আহত করেছে। পুরো জনগোষ্ঠীকে অনাহারে রেখেছে, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে এবং পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গাজার জীবনধারণের বেশিরভাগ অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে।
সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য যদি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন হয়, তাহলে সাফল্যের মাপকাঠি নিহত মানুষের সংখ্যা বা ধ্বংসের পরিমাণ হতে পার না। এর মাপকাঠি হলো- কাঙ্ক্ষিত শর্তে সংঘাতের অবসান ঘটেছে কি না।
কিন্তু এই রক্তপাতের তিন বছর পর, ইসরায়েল তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে এমন কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে অক্ষম বলে মনে হচ্ছে, যা তাদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোকে প্রতিফলিত করে।
শুরু থেকেই ইসরায়েল সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তাদের লক্ষ্য হলো- বন্দীদের মুক্ত করা, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন চিরতরে শেষ করা, গাজা উপত্যকার নিরাপত্তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং একটি বিকল্প প্রশাসন গড়ে তোলা। এছাড়া তারা ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে বিতাড়িত করার পথ প্রস্তুত করার ইচ্ছাও প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশ করেছে।
তাহলে তারা এ পর্যন্ত কী অর্জন করেছে?
প্রথমত, সব বন্দী মুক্ত হয়েছে। তবে গাজায় নিয়ে যাওয়া ২৫০ জন বন্দীর মধ্যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মাত্র আটজনকে মুক্ত করতে পেরেছে এবং আরো ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করতে পেরেছে। তারা অন্তত তিনজনকে গুলি করে হত্যা করেছে এবং বোমা হামলার সময় অজানা সংখ্যক বন্দীকে হত্যা করেছে।
বেশিরভাগ বন্দী- মৃত বা জীবিত- হামাসের সঙ্গে দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমেই মুক্তি পেয়েছে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বন্দীদের বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দায়িত্বে থাকা প্রধান ব্যক্তি সম্প্রতি বলেছেন যে, চাইলে বন্দীদের এক বছর আগেই মুক্ত করা যেত এবং নিহতদের অনেকের জীবন বাঁচানো সম্ভব ছিল। এ থেকেই পরিষ্কার যে, বন্দীদের মুক্তির বিষয়ে প্রবল সামরিক শক্তি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাপক সামরিক অভিযান ও বহু নেতার প্রাণহানির পরও ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের উপস্থিতি শেষ করতে পারেনি। ইসরায়েলি বোমা হামলা এবং ইসরায়েলপন্থি ফিলিস্তিনি মিলিশিয়াদের আক্রমণ সত্ত্বেও হামাস এখনো উপত্যকার কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। শক্তি প্রয়োগ করে হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করাতে ব্যর্থ হয়ে ইসরায়েল এখন তাদের সাথেই আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে।
ইসরায়েল বারবার বাস্তুচ্যুতি, অনাহার, বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস এবং ‘স্বেচ্ছায় প্রস্থান’-এর নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছে। ধ্বংসযজ্ঞ এই উপত্যকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে, কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা এখানেই থাকতে চায়।
তৃতীয়ত, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশ দখল করেছে, কিন্তু বাকি অংশ দখল করার জন্য কোনো বড় ধরনের অভিযান থেকে তারা বিরত রয়েছে। এর কারণ হলো তারা বুঝতে পেরেছে যে এমন সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক, মানবিক এবং সামরিক খরচ অনেক বেশি হবে।
চতুর্থত, ইসরায়েল ও তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন এবং জাতিসংঘকে বাদ দিয়ে গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন ও বিকল্প প্রশাসনের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরিতে প্রচুর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে সেই প্রচেষ্টা মূলত ব্যর্থ হয়েছে। গাজার প্রশাসনিক কমিটি দেশ শাসনভার গ্রহণ করতে ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি এবং চুক্তির মানবিক বিধানগুলোও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
সর্বশেষ, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইসরায়েল বারবার বাস্তুচ্যুতি, অনাহার, বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস এবং ‘স্বেচ্ছায় প্রস্থান’-এর নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছে। ধ্বংসযজ্ঞ এই উপত্যকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে, কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা এখানেই থাকতে চায়। এমনকি মিশর থেকেও অনেকে ফিরে এসেছেন।
এই মুহূর্তে এটি পরিষ্কার যে ইসরায়েল গাজায় একটি ‘পরবর্তী দিনের’ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তাদের সামরিক বাহিনী উপত্যকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে সক্ষম, কিন্তু ইসরায়েলি লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষাকে সন্তুষ্ট করে এমন কোনো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ে তুলতে পারছে না।
গাজাকে একটি সর্বনাশা ভূদৃশ্যে পরিণত করলে পুরো জনগোষ্ঠী এমন হতাশার মধ্যে পড়বে যে তারা তাদের নিজেদের অধিকার ও সংগ্রামের আশা ছেড়ে দেবে- এই আশাবাদ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনিদের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি, তাদের অব্যাহত প্রতিরোধ এবং ফিলিস্তিনি দাবির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব প্রমাণ করেছে যে ব্রুটাল বা নৃশংস আগ্রাসনের ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গি ব্যর্থ হয়েছে।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলকে মার্কিন সমর্থন দেওয়া নিয়ে বিতর্ক এখন এতদূর গড়িয়েছে যে, অনেক আইনপ্রণেতাই সামরিক সাহায্য কমানো বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে বিল আনছেন। ইউরোপের রাজধানীগুলোতেও একই ধরনের আলোচনার জেরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সাথে বাণিজ্যের ওপর সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সামরিক শক্তি একটি সাময়িক বাস্তবতা চাপিয়ে দিতে পারে, কিন্তু এটি নিজে থেকে কোনো রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করতে পারে না। আরও খারাপ বিষয় হলো, এটি আদতে বৈধতা ধ্বংস করতে পারে। আর ঠিক এটিই ঘটেছে ইসরায়েলি সরকার এবং সামগ্রিকভাবে ইসরায়েলি প্রকল্পের ক্ষেত্রে।
গত মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে পডিয়ামে ওঠেন, তখন জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা হল থেকে ওয়াকআউট করেন (বের হয়ে যান)।
নেতানিয়াহু নিজে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি রয়েছেন।
আর এই ইসরায়েলি গণহত্যা যুদ্ধ কেবল তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেই ধ্বংস করেনি।
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ কর্তৃক ইসরায়েল ক্রমবর্ধমানভাবে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। ৩৬টি দেশের ওপর চালানো পিউ রিসার্চ সার্ভিসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দেশটিকে নেতিবাচকভাবে দেখে। ইসরায়েলের প্রধান মিত্রদের জনগণও দেশটিকে ক্রমবর্ধমানভাবে নেতিবাচক হিসেবে দেখছে: যুক্তরাষ্ট্র- ৬০ শতাংশ; জার্মানি- ৭৩ শতাংশ; যুক্তরাজ্য- ৬৯ শতাংশ; ফ্রান্স- ৬৮ শতাংশ।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন নিয়ে বিতর্ক এতটাই তীব্র হয়েছে যে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক আইনপ্রণেতা সামরিক সহায়তা সীমিত করা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবকারী বিলগুলোকে সমর্থন করছেন। ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতেও অনুরূপ আলোচনার ফলে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সাথে বাণিজ্যে সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আজ ইসরায়েলি নেতারা তাদের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন, সামরিক সাফল্যের বড়াই করবেন, সামরিক পরাক্রম উদযাপন করবেন এবং আরও প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবেন।
কিন্তু সত্য হলো- সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান, অত্যাধুনিক ড্রোন এবং এআই-নিয়োজিত ৯০০ টন ওজনের বোমা নিয়ে সজ্জিত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ছোট অস্ত্র নিয়ে লড়াই করা একটি দুর্বল নন-স্টেট অ্যাক্টরের (রাষ্ট্রীয় কাঠামোহীন পক্ষ) বিরুদ্ধে একটি গণহত্যা যুদ্ধ শুরু করেছিল... এবং হেরে গেছে।
মানুষকে হত্যা করা যায়, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় এবং ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু ফিলিস্তিনের যে জাতীয় দাবি দশকের পর দশক ধরে বিশ্বজুড়ে অনুরণিত হয়ে আসছে, তা সামরিক শক্তি দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
আল-জাজিরা থেকে অনূদিত
