

মো: মেহেদী হাসান, পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: মঞ্চ ছিল না, ছিল না কোনও দৃশ্যপট। অথচ কেবল শব্দ, সংলাপ আর কণ্ঠের জাদুতেই কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কল্পনায় তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য চরিত্র ও গল্পের পৃথিবী। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বেতারের সেই মঞ্চহীন নাট্যজগতের নেপথ্যের কারিগর মোস্তফা মোহাম্মদ আবদুর রব। একসময় তাঁর নতুন নাটকের অপেক্ষায় থাকতেন বেতারের শ্রোতারা। আজ সেই প্রবীণ নাট্যকারই স্ট্রোকজনিত অসুস্থতায় শয্যাশায়ী। রাজশাহীর বানেশ্বর (খুটিপাড়া) নিজ বাসভবনেই চলছে তাঁর চিকিৎসা।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল তাঁর প্রথম নাটক ‘প্রত্যাশিত আলো’। তারপর থেকে দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা। একের পর এক মৌলিক নাটক লিখে বেতারের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাঁর লেখা রোমান্টিক ও ঐতিহাসিক নাটক বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। পাঁচ দশকের এই পথচলায় তাঁর প্রায় পাঁচশো নাটক বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বেতারের গণ্ডিও পেরিয়েছিল তাঁর লেখা। তাঁর নাটক প্রচারিত হয়েছে বিবিসি বাংলা ও রেডিও জাপানে। সাক্ষাৎকারও প্রচার করেছে বিবিসি বাংলা ও বাংলাদেশ বেতার। শব্দের সেই জগতে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজস্ব পরিচয়।
পেশাগত জীবনে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন মোস্তফা মোহাম্মদ আবদুর রব। বানেশ্বর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ দক্ষ শিক্ষক ছিলেন। অবসর নিলেও সাহিত্য থেকে দূরে সরে যাননি। নাটকের পাশাপাশি লিখেছেন কবিতা। বানেশ্বর থেকে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত সাহিত্যপত্র ‘অনির্বাণ’-এর সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত তিনি; পত্রিকাটির উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বেতারনাট্যে তাঁর সৃষ্টিশীলতার একটি নথিভুক্ত দৃষ্টান্ত ‘আছো তুমি অন্তরে’। ২০২১ সালে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতারে নাটকটির রেকর্ডিং হয়। নাটকটির রচয়িতা মোস্তফা মোহাম্মদ আবদুর রব। পরিচালনায় ছিলেন মনোজ সেনগুপ্ত। অভিনয়ে ছিলেন তানভীন সুইটি, তরু মোস্তফা, আরমান পারভেজ মুরাদ-সহ একাধিক শিল্পী।
বেতারনাটকের সৌন্দর্যই অন্য রকম। সেখানে চোখের সামনে অভিনেতা নেই, নেই মঞ্চের আলো। শ্রোতার কানে পৌঁছনো সংলাপ, শব্দ ও আবহের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় চরিত্র, পরিবেশ ও আবেগ। সেই কঠিন শিল্পকে দীর্ঘদিন ধরে নিজের লেখায় ধারণ করেছেন মোস্তফা মোহাম্মদ আবদুর রব।
কিন্তু দীর্ঘ এই সাহিত্যযাত্রার পরও জাতীয় পর্যায়ের বড় কোনও পুরস্কার বা স্বীকৃতি তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। ঘনিষ্ঠজনদের মতে, প্রচারবিমুখ স্বভাবের কারণেই হয়তো তিনি অনেকটাই আড়ালে থেকে গিয়েছেন। সাহিত্যাঙ্গনের অনেকের মতে, তাঁর দীর্ঘ বেতার নাট্যচর্চা জাতীয় পর্যায়ে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
তাঁকে ঘিরে এবার স্মৃতি সংরক্ষণেরও উদ্যোগ হয়েছে। আগামী ২১শে গ্রন্থমেলাকে সামনে রেখে ‘অনির্বাণ’ লিটল ম্যাগাজিনের উদ্যোগে মোস্তফা মোহাম্মদ আবদুর রবকে নিয়ে একটি স্মারক সংখ্যা প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। আয়োজকদের আশা, তাঁর দীর্ঘ সাহিত্য ও নাট্যজীবনের নানা অধ্যায় সেখানে উঠে আসবে।
যে মানুষটি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্যের কণ্ঠে নিজের লেখা চরিত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, আজ তাঁর নিজের কণ্ঠই অসুস্থতার কাছে থমকে আছে। একসময় বেতারের তরঙ্গে ভেসে যাওয়া তাঁর নাটকের সংলাপ হয়তো এখন আর আগের মতো শোনা যায় না। কিন্তু শ্রোতার স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে সেই শব্দের জাদু।
মোস্তফা মোহাম্মদ আবদুর রব তাই শুধু একজন বেতার নাট্যকার নন—বাংলাদেশের বেতারনাট্যের এক দীর্ঘ সময়ের নেপথ্য-সাক্ষী। তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছেন সাহিত্য ও সংস্কৃতিমহলের মানুষ।
