

খালিদ হোসেন মিলু, বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি: প্রাচীন স্থাপনার গায়ে সময়ের ছাপ। চারপাশে সবুজের সমারোহ। কোথাও দর্শনার্থীদের ব্যস্ততা, কোথাও ক্যামেরার ক্লিক। এরই মধ্যে বাউল গানের সুরে ভেসে আসছে হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা। বিশ্ব পর্যটন দিবসে এমনই এক প্রাণবন্ত আবহে মুখর হয়ে উঠেছিল নওগাঁর বদলগাছীর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনকে ঘিরে ছিল উৎসবের আমেজ। র্যালি, আলোচনা সভা, বাউলগান ও প্রত্নবস্তুর উন্মুক্ত প্রদর্শনী সহ নানা আয়োজনে উদ্যাপন করা হয় বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২৬।
দিবসের আয়োজন শুরু হয় পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার জাদুঘর চত্বর থেকে বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্য দিয়ে। পরে পাহাড়পুর জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান।
আলোচনায় উঠে আসে পাহাড়পুরের ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও পর্যটনের সম্ভাবনার নানা দিক। বক্তারা বলেন, শুধু একটি প্রত্নস্থাপনা হিসেবে নয়, পাহাড়পুরকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের এই নিদর্শন সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে দিনের আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল পাহাড়পুরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বাউলগানের সুরে তুলে ধরা। বাউল শিল্পীদের গানে মিশে যায় বাংলার মাটি, মানুষ ও ঐতিহ্যের গল্প। আর দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংগ্রহে থাকা বিভিন্ন প্রত্নবস্তু।
পাহাড়পুর শুধু ইট-পাথরের পুরোনো স্থাপনা নয়। পাল আমলে নির্মিত সোমপুর মহাবিহার ছিল বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইতিহাসের পাতায় যার পরিচিতি ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে।
স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৮৫ সালে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। এরপর থেকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রত্নস্থল।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে পাহাড়পুরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের চোখেমুখেও ছিল মুগ্ধতা। কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরেছেন, কেউ প্রাচীন স্থাপনার সামনে ছবি তুলেছেন। আবার কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন পাহাড়পুরের অতীতের গল্প।
দর্শনার্থীরা জানান, বইয়ের পাতায় পাহাড়পুরের ইতিহাস পড়েছি। কিন্তু সামনে এসে এর বিশালত্ব ও স্থাপত্য দেখে অন্য রকম অনুভূতি হয়েছে। এমন আয়োজন ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ তৈরি করে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিশ্ব পর্যটন দিবসের আয়োজন যেন শুধু একটি দিনের উৎসব হয়ে না থাকে। সারা বছর পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে প্রয়োজন উন্নত তথ্যসেবা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, বিশ্রামের ব্যবস্থা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করারও দাবি তাঁদের।
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কাস্টোডিয়ান মুহাম্মদ ফজলুল করিম বলেন, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে রাস্তা, লেক, ফুটপাত, উন্মুক্ত মঞ্চ, গাড়ি পার্কিং, আধুনিক টিকিট কাউন্টার, গণশৌচাগার, ভিআইপি লাউঞ্জসহ নানা কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রাচীন এই বিহারকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের আয়োজন শেষ হলেও পাহাড়পুরের গল্প শেষ হয় না। প্রতিদিনই এখানে আসে নতুন মানুষ, নতুন চোখ। কেউ খোঁজেন ইতিহাস, কেউ স্থাপত্যের সৌন্দর্য, কেউবা কয়েক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে যান হাজার বছরের অতীতে।
সময় বদলায়, মানুষ বদলায় কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে পাহাড়পুর আজও দাঁড়িয়ে আছে। আর তার বুকেই যেন প্রতিদিন লেখা হচ্ছে বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন গল্প।
