

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: সকাল থেকে গভীর রাত নগরের ব্যস্ত মোড়গুলোতে যানবাহনের স্রোত নিয়ন্ত্রণে দাঁড়িয়ে থাকেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। মাথার ওপর রোদ, চারপাশে ধুলাবালি, সঙ্গে গাড়ির হর্নের বিকট শব্দ। এর মধ্যেই বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের ধোঁয়া মিশে যায় তাঁদের শ্বাস নেওয়ার বাতাসে। পুরোনো ও ডিজেলচালিত যানবাহনের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
নগরবাসী দূষিত সড়ক অতিক্রম করে কিছু সময় পর গন্তব্যে পৌঁছান। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের একই পরিবেশে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয়। বায়ু ও শব্দদূষণ, অতিরিক্ত গরম, বৃষ্টি এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা—সব মিলিয়ে তাঁদের কর্মপরিবেশে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
দূষিত বাতাসেই দীর্ঘ সময় দায়িত্ব
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ সময় সড়কে অবস্থানের কারণে তাঁদের শারীরিক অস্বস্তি ও নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ধুলাবালি ও যানবাহনের ধোঁয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত শব্দও তাঁদের নিত্যসঙ্গী।
এক নারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর মধ্যে ধুলাবালি, গাড়ির কালো ধোঁয়া, বায়ুদূষণ ও অতিরিক্ত শব্দের কারণে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও দায়িত্বের কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ওই নারী সদস্যের আরেকটি অভিযোগ, অনেক ট্রাফিক বক্সে নারী সদস্যদের জন্য পৃথক শৌচাগার বা পর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা নেই। এতে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের বাড়তি সমস্যায় পড়তে হয়।
ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জাকির হোসেন ২১ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৩ বছর ধরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। জাকির হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর ফলে অনেকের অল্প বয়সেই কর্মক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে পা, হাঁটু ও কোমরে ব্যথা হয়। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে কানে কম শোনার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।’
ট্রাফিক পুলিশ বক্সগুলো আরও পরিবেশবান্ধব ও ব্যবহার উপযোগী করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
ধোঁয়ার অদৃশ্য কণা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ
ট্রাফিক পুলিশের জন্য বায়ুদূষণের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় সূক্ষ্ম বস্তুকণা—পিএম ২.৫ ও পিএম ১০। এসব কণা এত ছোট যে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে শ্বাসতন্ত্রের পাশাপাশি হৃদ্রক্তনালি ও মস্তিষ্কের রক্তনালির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, পরিবহন খাতের বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে শুধু যানবাহনের ধোঁয়া নয়, সড়কের ধুলা এবং ব্রেক ও টায়ারের ক্ষয় থেকে তৈরি কণাও ভূমিকা রাখে। এসব দূষকের সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, হাঁপানি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ সড়কের দূষণ শুধু চোখে দেখা কালো ধোঁয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতি সূক্ষ্ম কিছু কণা খালি চোখে দেখা না গেলেও শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষণাতেও উঠে এসেছে উদ্বেগ
ট্রাফিক পুলিশের স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। কিছু গবেষণায় ট্রাফিক পুলিশের বায়ুদূষণের সংস্পর্শ এবং শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্স্বাস্থ্য ও চোখের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
কলম্বিয়ার বোগোতায় ৫৭৪ জন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় অফিসে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের তুলনায় ট্রাফিক পুলিশের ব্যক্তিগত পিএম ১০-এর সংস্পর্শ বেশি পাওয়া যায়। ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে কাশি, কফ, নাক ও সাইনাসের সমস্যা এবং নাকে জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গও বেশি দেখা গেছে বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
থাইল্যান্ড, ভারত ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণাতেও ট্রাফিক পুলিশের পেশাগত বায়ুদূষণের সংস্পর্শ এবং শ্বাসতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। একটি গবেষণায় ট্রাফিক পুলিশের পিএম ২.৫-এর সংস্পর্শ এবং ফুসফুসের কিছু কার্যক্ষমতার সূচকের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া যায়।
তবে এসব গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি ‘বায়ুদূষণের কারণে রোগ হয়েছে’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। গবেষণাগুলো মূলত সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ-ফল নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার প্রভাব
শুধু বায়ু ও শব্দদূষণ নয়, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকাও ট্রাফিক পুলিশের জন্য শারীরিক চাপ তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আমিনউদ্দিন এ. খান বলেন, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে পায়ের পেশিতে ব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পিণ্ডলি ও উরুতে ব্যথা, পায়ের পাতা বা গোড়ালিতে ব্যথা, পায়ের পাতায় জ্বালাপোড়া এবং পেশিতে টান ধরতে পারে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা ও হাঁটুর ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে হাঁটুর ব্যথা হতে পারে। পা ফুলে যাওয়ার পাশাপাশি শরীরের নিচের অংশে রক্ত জমে থাকার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন অবস্থায় দায়িত্ব পালন করলে কিছু মানুষের পায়ের শিরা ফুলে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
দায়িত্ব পালনে যাতায়াতের চাপও আছে
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক সদস্যদের জন্য দামপাড়া পুলিশ লাইনে ব্যারাক রয়েছে। তবে নগরের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেক সদস্যকে দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে হয়।
মইজ্জারটেক, নতুন ব্রিজ, বিমানবন্দরসহ দূরবর্তী এলাকায় দায়িত্ব পালনের জন্য যাতায়াতেই উল্লেখযোগ্য সময় চলে যায়। ফলে আট ঘণ্টার দায়িত্বের বাইরে যাতায়াতেও বাড়তি সময় ব্যয় হয়। এতে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ কমে যেতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্ট সদস্যরা।
এ ছাড়া সব এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ বক্স বা ক্যানপি নেই। কোথাও বক্স থাকলেও শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকার অভিযোগ রয়েছে। নারী সদস্যদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজন বিশেষ ব্যবস্থা
সড়কে দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের একসঙ্গে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, রোদ, বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপ এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার মতো বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এ অবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, উন্নত ট্রাফিক বক্স, নারী সদস্যদের জন্য পৃথক স্যানিটেশন সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএমপির ট্রাফিক বন্দর বিভাগের টিআই (অ্যাডমিন) আবু সাঈদ বাকের বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের একদিকে যেমন বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, রোদ-বৃষ্টির মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়, অন্যদিকে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও অনেক কম। তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’
চট্টগ্রামের সড়কে যানবাহনের চাপ ও নগরায়ণ বাড়ার সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বও বাড়ছে। প্রতিদিন নগরের সড়কে দাঁড়িয়ে যাঁরা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখছেন, তাঁদের কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
