

সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি: প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছর। প্রায় সাত একর জমি, দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, অর্ধশতাধিক শিক্ষক, একাধিক অনার্স কোর্স ও দীর্ঘদিনের শিক্ষা কার্যক্রম, সবই আছে বরিশালের বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে। নেই শুধু সরকারি কলেজের মর্যাদা। চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা উদ্যোগ, স্মারকলিপি ও আইনি পদক্ষেপের পরও প্রতিষ্ঠানটির জাতীয়করণ হয়নি।
ফলে দীর্ঘদিনের এ দাবি এখন শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে পুরো বাবুগঞ্জবাসীর প্রত্যাশায়।
স্থানীয়দের মতে, বাবুগঞ্জ উপজেলা সদর ও আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান এ কলেজ।
আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী দূরের সরকারি কলেজে গিয়ে পড়াশোনা করার সামর্থ্য রাখে না। উপজেলা সদরের কলেজটি সরকারি হলে এসব শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা সদরে প্রায় সাত একর জমির ওপর ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওহাব খান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব সিরাজ উদ্দিন আহমেদ এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে উচ্চমাধ্যমিক থেকে ডিগ্রি এবং পরে অনার্স পর্যায়ে বিস্তৃত হয় কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম। বর্তমানে কলেজটিতে ৫৫ জনের বেশি শিক্ষক, ১৫ জনের বেশি কর্মচারী, ২০টির বেশি শ্রেণিকক্ষ এবং দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখা এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা এই কলেজকে জাতীয়করণের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণের দাবি নতুন নয়। ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই কলেজ কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জাতীয়করণের দাবিতে স্মারকলিপি দেন। ওই সময় কলেজটির ভালো ফলাফল এবং বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ কলেজগুলোর তালিকায় অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। জাতীয়করণের তালিকায় কলেজটির নাম না থাকায় একপর্যায়ে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
জাতীয়করণের জন্য সরকারঘোষিত শর্ত পূরণের দাবি তুলে কলেজ কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতে রিট করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রুল জারি হয়।তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রক্রিয়ার পরিণতি হিসেবে কলেজটি এখনো সরকারি হয়নি।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে প্রতিষ্ঠানটি ৪৩ বছর ধরে একটি উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে, সেটি আর কতদিন বেসরকারি কাঠামোয় থাকবে?
বাবুগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং উচ্চশিক্ষার চাহিদা বাড়লেও সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ সীমিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উপজেলা সদরে একটি সরকারি কলেজ থাকলে শিক্ষার্থীদের দূরে গিয়ে পড়াশোনার খরচ, যাতায়াত ও আবাসনসংক্রান্ত বাড়তি চাপ কমবে।
তাঁদের আরও দাবি, সরকারিকরণ হলে সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক ল্যাব, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আ.ন.ম. আব্দুল হালিম বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজটি জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। উপজেলার শিক্ষা ও পড়াশোনার মান এবং বিগত দিনের ফলাফল বিবেচনা করলে অনেক আগেই কলেজটি জাতীয়করণের উপযুক্ত হয়েছে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কলেজটির জাতীয়করণের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘বাবুগঞ্জ উপজেলা সদরে একটি সরকারি কলেজ অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি, অচিরেই এটি সরকারিকরণের আওতায় আসবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে শিক্ষার্থী সংখ্যা, জমির পরিমাণ, অবকাঠামো, শিক্ষা কার্যক্রম, ফলাফল, এলাকার শিক্ষার চাহিদা এবং দীর্ঘদিনের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তাঁদের মতে, বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তাই জাতীয়করণের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছর পরও সরকারি মর্যাদা না পাওয়া বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজকে জাতীয়করণের দাবি এখন বাবুগঞ্জের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের আশা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। এতে এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
