

মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল, কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি: নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আমতলা রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়নের বঙ্গবাজার সংলগ্ন চাপুরি গ্রামে গড়ে উঠেছে দুইটি বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান। ফকির অটো রাইস মিল ও সাইফা অটো রাইস মিল নামে দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হলেন জীবন সংগ্রামে জয়ী সফল উদ্যোক্তা শহীদুল ইসলাম কামাল ফকির। তিনি চাপুড়ি গ্রামের হাজী মোঃ আবুল কাশেম ফকির ও মোছা: আমেনা খাতুনের ৪ ছেলে ও ৪ মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান। তিনি ১৯৭৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। কেন্দুয়া উপজেলার মধ্যে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কঠিন পরিশ্রমের মধ্য কামাল বর্তমানে স্বাবলম্বী একজন মানুষ।
শৈশব কৈশোর পেরিয়ে মেধাবী ছাত্র হিসেবে মাধ্যমিকে পড়াশোনাকালীন সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে মাত্র ৪ মণ ধান পুঁজি হিসেবে নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ফলে তার আর পড়াশোনা করা হয়নি। ৪ মণ ধান বাজারে বিক্রি করে ৮০০ টাকা পান। সেই টাকা মূলধন হিসেবে নিয়ে সংসারের হাল ধরতে স্বল্প পুঁজিতেই প্রত্যন্ত এলাকার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কৃষকের বাড়ি থেকে ধান কিনে তা বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা শুরু করেন। ধান কিনে তা কখনো সাইকেল বা রিকশাযোগে রায় বাজার আঠারোবাড়ি বাজারে বিক্রি করতেন। এভাবেই তিনি শুরু করেন তাঁর কর্মজীবন ও সংসারের গুরুদায়িত্ব। এভাবে দীর্ঘদিন কঠিন পরিশ্রম করে করতে করতে এক সময় তার মাথায় চিন্তা কাজ করে ধান থেকে চাল উৎপাদন করে বিক্রি করলে আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন।
পরবর্তী নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অধিক লাভের প্রত্যাশায় ১৯৯৬ সালে দশ মণ ধানের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন চাতাল তৈরি করে চাল উৎপাদন করে বাজারজাত শুরু করেন। এতে তিনি লাভবান হন। সেই উৎসাহে চাতাল তৈরি করে (সেলু মেশিনের ইঞ্জিন) ডিজেল চালিত ইঞ্জিন দ্বারা উৎপাদিত চালের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে সময়ের পরিক্রমায় দশ মণ থেকে ৫০ মণ, ৫০ মণ থেকে ২০০ মণ, ২০০ মণ থেকে ৫০০ মণ ধানের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন চাতাল তৈরি করে ধান থেকে চাল উৎপাদন করে বাজারজাত করে তিনি পরিশ্রমী মানুষ ও সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করেন। ২০০৫ সালে নান্দাইল উপজেলার রসূলপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি বিবাহ করেন। এছাড়াও তিনি সে সময় গরুর খামার ও চাতাল কার্যক্রমের মাধ্যমে সে তার জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সংকল্প করে কঠোর পরিশ্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেন।
সফল ব্যবসায়ী হিসেবে চারিদিকে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তিনি ২০০৬ সালে ব্যাপকভাবে কার্যকম পরিচালনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আধুনিকায়নের যুগে ২০১৪ সালে সেমি অটোরাইস মিল স্থাপন করেন। পরবর্তীতে চাল উৎপাদনে ফকির অটো রাইস মিল ও সাইফার অটো রাইস মিল নামে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে শহীদুল ইসলাম ফকির কামাল, জামাল উদ্দিন ফকির, শফিকুল ইসলাম ফকির, রফিকুল ইসলাম ফকির রকি চার ভাই মিলেমিশে তাদের বৃহৎ এই দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।
শহীদুল ইসলাম ফকির কামালের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আন্তরিকতায় বর্তমানে তাদের ৩০/৩৫ জনের যৌথ পরিবার একসাথে বসবাস করছে। যা বর্তমান সময়ে খুবই বিরল। তার পরিশ্রমের আয় থেকে তিনি পরিবারের সকলকে নিয়ে বসবাসের জন্য বহুতল বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি নির্মাণ করেছেন।
এ দুটি প্রায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে প্রায় ৩০০ জন শ্রমিক কাজ করে। নারী শ্রমিক ১০ জন কাজ করেন। পরিবহন শ্রমিক, ধান-চাল ওঠানামার শ্রমিক, মেকানিক, নিরাপত্তাকর্মীসহ পরোক্ষভাবে বিভিন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানে। এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকের সর্বনিম্ন আয় ১৫ হাজার সর্বোচ্চ আয় ৫০ হাজার টাকা। উৎপাদন ভিত্তিক শ্রমিকদের আয় তাদের কাজের উপর ভিত্তি করে কম বেশি হয়।
জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ বিল প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়মিত পুরস্কার প্রাপ্ত। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সময়ে পুরস্কার পেয়েছেন। তবে এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা রাস্তাঘাট, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বলে জানিয়েছেন কামাল ফকির।
সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে ফকির অটো রাইস মিলের কর্ণধার কামাল জানান, এ প্রতিষ্ঠানের ধান, চাল পরিবহনের জন্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে টেকসই রাস্তা নির্মাণের সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ ও এই প্রতিষ্ঠানে আলাদা ফিডারের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আমি জোর দাবি জানাচ্ছি।
এছাড়াও তিনি বলেন, অটোমেটিক মেশিনের ব্যবহার করে ধান শুকানো, সিদ্ধ, ভাঙানো ও প্যাকেটজাত করার আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। সুগন্ধা নামে চাল বাজারজাত করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে কী পরিকল্পনা আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে জীবনযুদ্ধে সফল শহীদুল ইসলাম ফকির কামাল বলেন, বর্তমানে আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শিক্ষিত ও উচ্চ শিক্ষিত। নিজস্ব অর্থায়নে একটি মসজিদ নির্মাণ কাজ চলমান। এতিম অসহায়দের সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন। ভবিষ্যতে একটি এতিমখানা করার ইচ্ছে রয়েছে।
