ঢাকা
logo
প্রকাশিত : July 26, 2026

চার দশকের আলোকযাত্রা: হাওরের শিক্ষক ইউসুফ আলী খান

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার পেছনে কিছু মানুষের নীরব শ্রম আর আত্মত্যাগ ইতিহাস হয়ে থাকে। তেমনই একজন মো. ইউসুফ আলী খান। প্রায় চার দশক ধরে দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ও পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বাহাদুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসীর আস্থা, ভালোবাসা ও প্রেরণার প্রতীক।

জন্ম ১৯৬০ সালে। দোয়ারাবাজার উপজেলার বাতলারটেক গ্রামের বাসিন্দা ইউসুফ আলী খান। তাঁর পিতা প্রয়াত শামসুল হক খান ছিলেন এ অঞ্চলের সুপরিচিত ও বিত্তবান ব্যক্তি; মাতা প্রয়াত ফুলমেহের নেছা। শিক্ষাজীবনের সূচনা সদর ইউনিয়নের বীরসিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে কুমিল্লার চিওড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর নিজ এলাকার টেবলাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

সাবেক দোয়ারাবাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং তাঁর আপন মামা, বীরমুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলামের উৎসাহে তিনি নিজ এলাকা ছেড়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের হাওরবেষ্টিত বাহাদুরপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। তখন বিদ্যালয়টি ছিল জরাজীর্ণ টিন-ছাউনির একটি অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান—না ছিল পাকা ভবন, না ছিল পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী।

দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিজেকে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে আটকে রাখেননি। গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা। বর্ষায় জলমগ্ন হাওর, শুকনো মৌসুমে দীর্ঘ পথ—সব উপেক্ষা করে বিদ্যালয়টিকে দাঁড় করানোই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের ব্রত।

বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হয় ২০১৩ সালে। কিন্তু তার অনেক আগে, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর তিনি শিক্ষকতা করেছেন কোনো বেতন ছাড়াই। পেশার প্রতি এমন দায়বদ্ধতার নজির এ অঞ্চলে বিরল।

১৯৮৮ সালে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য ও তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রয়াত হাবিজ উল্লাহ মোড়লের বাড়িতে লজিং হিসেবে ওঠেন তিনি। আজও সেই একই বাড়িতেই তাঁর বসবাস। প্রায় চল্লিশ বছর একই বিদ্যালয়ে চাকরি এবং একই বাড়িতে বসবাস—এমন ঘটনা সত্যিই বিরল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ইউসুফ আলী খান সহজ-সরল, সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও সদালাপী মানুষ। ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, শিক্ষার প্রসারই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, বাহাদুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মূলত তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছে। এ কারণেই দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁরা তাঁকে কখনো অন্যত্র যেতে দেননি। তাঁদের কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন—একজন অভিভাবক, মানুষ গড়ার কারিগর।

কেবল হাওরের শিশুদেরই নয়, নিজের সন্তানদেরও তিনি গড়ে তুলেছেন সমান যত্নে। ছয় সন্তানের জনক ইউসুফ আলী খান সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর সন্তানেরা হলেন—মোছাঃ ইয়াসমিন সুলতানা (রোমা), মোছাঃ শাম্মী আক্তার (রোজি), সাবরিনা খানম (রত্না), মোঃ রোকনুজ্জামান খান (সায়মন), নাজমুন নাহার খানম (জুঁই) এবং মোঃ আসাদুজ্জামান খান (রাহুল)। তাঁদের মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে বর্তমানে ইতালির স্থায়ী নাগরিক। যে নিষ্ঠা তিনি বিদ্যালয়ে ঢেলে দিয়েছেন, তারই প্রতিফলন যেন ঘটেছে তাঁর সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত জীবনে।

দীর্ঘ কর্মজীবনের ইতি টেনে আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পিআরএল ছুটিতে যাবেন।

অনুভূতি প্রকাশ করে ইউসুফ আলী খান বলেন, 'শিক্ষকতা আমার কাছে কখনোই শুধু একটি চাকরি ছিল না; এটি ছিল আমার জীবনের ব্রত। হাওরাঞ্চলের এই অবহেলিত জনপদের শিশুদের শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আজ অবসরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালে মনে হয়, মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি নেই। আমার হাতে গড়া একজন শিক্ষার্থীও যদি সৎ, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক মানুষ হয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারেন, তাহলেই আমার দীর্ঘ কর্মজীবন সার্থক।'

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হাওরের জনপদে তিনি যে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন, তার আলো আগামী প্রজন্মের পথচলাকেও আলোকিত করবে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram