

শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা: কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) এক যুগান্তকারী সম্প্রসারণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে অন্যতম বৃহৎ নগর প্রশাসনিক কাঠামোর একটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এই সিটি কর্পোরেশন। বর্তমানে মাত্র ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রায় ২৮৫ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান প্রায় ১০ লক্ষ নাগরিকের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হবে আরও প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ। ফলে সম্প্রসারিত কুমিল্লা নগরীর মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২৫ লক্ষে, যা নগর ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে।
বুধবার (৬ মে, ২০২৬) কুসিকের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই সম্প্রসারণে আদর্শ সদর উপজেলা ও সদর দক্ষিণ উপজেলা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে তাদের সব ইউনিয়ন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের সেনানিবাস এলাকাসহ অধিকাংশ অংশও নতুন সীমানায় যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে কুমিল্লা শহরের ভৌগোলিক পরিসর যেমন বিস্তৃত হবে, তেমনি প্রশাসনিক কার্যক্রমও নতুন মাত্রা পাবে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে কুমিল্লা পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ড এবং সদর দক্ষিণ পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড বিলুপ্ত করে মোট ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে ৫৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে সিটি কর্পোরেশন সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে তৎকালীন কুসিক কর্তৃপক্ষ প্রথম বড় পরিসরে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়, যেখানে আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ও পাঁচথুবি ইউনিয়ন বাদে বাকি ৪টি ইউনিয়ন এবং সদর দক্ষিণ উপজেলার অধিকাংশ এলাকা এবং লালমাই উপজেলার ২টি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত করে প্রায় ১৯২ বর্গকিলোমিটারের একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরী কুসিক সম্প্রসারণকে তার নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর প্রস্তাবনায় আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ও পাঁচথুবি ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা ও সদর দক্ষিণ উপজেলার সব ইউনিয়নের পাশাপাশি লালমাই উপজেলার ২টি ইউনিয়ন এবং বুড়িচং উপজেলার ময়নামতির অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উঠে আসে।
তবে গত ২৮ এপ্রিল কুসিক মিলনায়তনে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় লালমাই উপজেলার প্রতিনিধিরা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানান। তাদের এই আপত্তির প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে লালমাই উপজেলাকে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এরপর কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিনের পরামর্শে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করে কুসিক প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু নতুন করে সম্প্রসারিত সীমানা চূড়ান্ত করেন। সংশোধিত প্রস্তাবে আদর্শ সদর উপজেলা এবং সদর দক্ষিণ উপজেলার সব ইউনিয়ন অপরিবর্তিতভাবে যুক্ত রাখা হয়। এবং বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের সেনানিবাসসহ অধিকাংশ এলাকা যুক্ত করা হয়। ফলে বর্তমানে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যমান ৫৩ বর্গকিলোমিটারের সঙ্গে নতুন করে প্রায় ২৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা যুক্ত হয়ে মোট আয়তন দাঁড়াচ্ছে ২৮৫ বর্গকিলোমিটারে।
এই সম্প্রসারণের ফলে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন কেবল আয়তনে বড় হচ্ছে না, বরং এটি একটি বৃহৎ মহানগর কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে সিটি কর্পোরেশন পরিচালনা করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা ও নগর পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই সম্প্রসারণ কুমিল্লাকে দেশের অন্যতম আধুনিক ও টেকসই নগরীতে রূপান্তর করতে পারে।
কুসিকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রসারণ সংক্রান্ত প্রায় সব প্রশাসনিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুর স্বাক্ষরের পরই প্রস্তাবটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
এ বিষয়ে কুসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত কমিটি ২৮ এপ্রিল কুসিকের অতীন্দ্র মোহন রায় সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ করেছে এবং তা নথিভুক্ত করেছে। সেই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই বর্তমান ৫৩ বর্গকিলোমিটারের সঙ্গে আরও ২৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা যুক্ত করে একটি চূড়ান্ত প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে, যা খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
অন্যদিকে কুসিক প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, মাননীয় কৃষিমন্ত্রী হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে কুমিল্লা সিটির আয়তন ও জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে সরকারের উন্নয়ন বাজেটও বাড়বে। এতে করে নাগরিক সেবার মান উন্নত হবে এবং কুমিল্লা একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও টেকসই নগরীতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
আগামী কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে এই নতুন সীমানা কার্যকর হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক টিপু আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন বর্ধিত সীমানা নিয়েই আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।
নগরবিদদের মতে, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের এই বৃহৎ সম্প্রসারণ কেবল প্রশাসনিক সীমানা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কুমিল্লার নগর উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং এই বিশাল পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবে রূপ নেয়।

