

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ভাঙা হাতের চিকিৎসা নিয়ে সোহেল রানা নামের এক পল্লী চিকিৎসকের ভুলে ৭ বছরের আবিদ নামের এক শিশু ডান হাতের চারটি আঙুল হারিয়ে এখন ঢাকা বারডেম হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। এ নিয়ে এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিশু আবিদ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হামিদপুর চিত্তিপাড়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। অপরদিকে অভিযুক্ত পল্লী চিকিৎসক সোহেল রানা একই উপজেলার ফুলহার গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ঈদুল ফিতরের ৩ দিন পর আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে অটোভ্যান থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয় শিশু আবিদ। এতে তার ডান হাতের হাড় ভেঙে যায়। সে সময় শিশুটির পিতা বাড়িতে না থাকায় পরিবারের লোকজন প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য তাকে ঘোড়াঘাট পৌরসভার আজাদমোড় ইসলামপুর এলাকার ‘শর্মী মেডিকেল স্টোর’ এ নিয়ে যান। মেডিকেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী নিজেকে ‘ডাক্তার’ পরিচয় দিয়ে শিশুটির হাতে প্লাস্টার করে দেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, হাতের প্লাস্টারটি অত্যন্ত শক্ত করে বাঁধা হয়েছিল। এতে হাত ধীরে ধীরে ফুলে যায় এবং একপর্যায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে শিশুটিকে রংপুর এবং পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসকরা তার ডান হাতের চারটি আঙুল কেটে ফেলতে বাধ্য হন।
শিশুটির পিতা রাজ্জাক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “একটি ভুল চিকিৎসায় আমার ছেলের সারা জীবনের ক্ষতি হয়ে গেল। আমি এর সঠিক বিচার চাই।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, মেডিকেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা স্বীকৃত চিকিৎসক না হয়েও দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি হাড় ভাঙা, হাড় জোড়া লাগানো এবং জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্টসহ বিভিন্ন জটিল চিকিৎসা ও প্রেসক্রিপশন প্রদান করে আসছেন। তার ব্যবহৃত প্রেসক্রিপশন প্যাডে ‘ডাক্তার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
এছাড়াও রোগীদের আকৃষ্ট করতে প্রেসক্রিপশনে ‘হাড় ভাঙা, জোড়া ও জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্টে বিশেষ অভিজ্ঞ’ এ ধরনের কথাও উল্লেখ করছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সোহেল রানা প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত রোগী দেখেন এবং বিভিন্ন রোগের জন্য ওষুধ লিখে দেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে অভিযুক্ত সোহেল রানা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি যথাযথভাবে প্লাস্টার করেছিলাম। পরে পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র নিয়ে যায়। কয়েক দিন পর আবার নিয়ে এলে হাতের অবস্থা খারাপ দেখি এবং দ্রুত রংপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেই।”
এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা এ রকম অবৈধ চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সোলায়মান হোসেন মেহেদী বলেন, “কোনো ব্যক্তি স্বীকৃত ডিগ্রি ও নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন না। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আমরা উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে তদন্তপূর্বক দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক আব্দুল আল মামুন কাওসার শেখ বলেন, “স্থানীয়দের অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে সমন্বয় করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
