

কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী প্রতিনিধি : নগরায়নের দ্রুত বিস্তারে বদলে যাচ্ছে সমাজ ও পারিবারিক কাঠামো। আধুনিকতার এই দৌড়ে যখন পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ছে, তখন অনেক প্রবীণ মানুষের শেষ বয়স কাটছে নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায়। এমন বাস্তবতায় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে গড়ে ওঠা ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’ হয়ে উঠেছে আশ্রয়হীন বাবা-মায়েদের এক নির্ভরতার ঠিকানা।
জানা যায়, বর্তমানে এই আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৯ জন প্রবীণ নারী-পুরুষ বসবাস করছেন। তাঁদের অনেকেরই সন্তান রয়েছে, কিন্তু বাস্তবতার নানা টানাপোড়েনে কেউ পাশে নেই। আবার কেউ হারিয়েছেন সবকিছু, হয়ে পড়েছেন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা খুঁজে পেয়েছেন এক টুকরো নিরাপদ ছায়া।
আশ্রমটিতে গিয়ে দেখা যায়, বিকেলের নরম আলোয় কেউ চুপচাপ জানালার পাশে বসে অতীতের স্মৃতিচারণায় মগ্ন, কেউবা অন্যদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠছেন। পরিবার হারানোর বেদনা থাকলেও এখানকার আন্তরিক পরিবেশ কিছুটা হলেও ভুলিয়ে দেয় সেই শূন্যতা।
সমাজসেবক সাজুদার রহমান সাজুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই বৃদ্ধাশ্রমে শুধু খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থাই নয়, প্রবীণদের মানসিক সুস্থতার দিকেও দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। একদল তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এখানে কাজ করছেন, যারা প্রবীণদের সেবা-যত্নে নিয়োজিত রয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে।

প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও বর্তমানে এখানে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা ইউনিট চালু করা হয়েছে। তবে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে অসুস্থদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নেই নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স। এছাড়া চলাচলে অক্ষমদের জন্য পর্যাপ্ত হুইলচেয়ারেরও প্রয়োজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামান্য সহযোগিতা ও সমাজের সহমর্মিতা পেলে এই আশ্রয়কেন্দ্রটি আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। এতে আরও অনেক অসহায় প্রবীণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয় রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এমন মানবিক উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ, প্রত্যেক বাবা-মায়ের শেষ বয়সটা সম্মান ও ভালোবাসায় কাটানোই একটি মানবিক সমাজের অন্যতম শর্ত।
‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’ তাই শুধু একটি আশ্রয়কেন্দ্র নয়, এটি মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—যেখানে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও হৃদয়ের বন্ধনই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শক্তি।

