

মাসুদ রানা, খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দূর থেকে তাকালে মনে হয় যেন কোনো ফুলের বাগান। হালকা বাতাসে সারি সারি গাছে ফুটে থাকা সাদা ফুল দোল খাচ্ছে নীরবে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়—এই সৌন্দর্যের আড়ালেই জন্ম নিচ্ছে সম্ভাবনার নতুন গল্প। এই ফুল থেকেই উৎপাদন হচ্ছে কালো সোনাখ্যাত পেঁয়াজের বীজ, যা বদলে দিচ্ছে কৃষকের ভাগ্য।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের নায়ক কৃষক তাইজ উদ্দিন। দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার খামারপাড়া ইউনিয়নের কায়েমপুর সরিষাপাড়া এলাকায় নিজের জমিতেই তিনি শুরু করেছেন শীতকালীন পেঁয়াজ বীজ চাষ। তার খেতে সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের কৃষকদের চোখে-মুখে দেখা দিয়েছে আগ্রহ আর আশার আলো।
দেশের শীর্ষ খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরে শীতকালীন মৌসুমে পেঁয়াজ কন্দ থেকে বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাইজ উদ্দিনের খেত এখন শুধু তার নিজের নয়, পুরো এলাকার জন্যই এক নতুন দৃষ্টান্ত। তার সাফল্য দেখে অনেক কৃষকই ভাবছেন—চেনা ফসলের বাইরে গিয়েও লাভজনক কিছু করা সম্ভব।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কৃষি বিভাগের সক্রিয় সহায়তা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে উপজেলায় মোট ১ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছেন ১০ জন কৃষক। প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় উপকরণ—পেঁয়াজ কন্দ, ডিএপি ও এমওপি সার, বালাইনাশক এবং বীজ সংরক্ষণের পাত্র। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তাইজ উদ্দিন জানান, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনি ৩৩ শতাংশ জমিতে ১৬০ কেজি পেঁয়াজের কন্দ রোপণ করেছেন। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি শতক জমি থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কেজি করে বীজ পাওয়ার আশা করছেন তিনি। তার ভাষায়, অন্যান্য ফসলের তুলনায় পেঁয়াজ বীজ চাষে খরচ কম হলেও লাভের সম্ভাবনা বেশি।
মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শ. ম. জাহেদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, পেঁয়াজ কন্দ থেকে বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবেই মানসম্মত বীজের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য কৃষকদের নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ভালো ফলন পান।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার জানান, সরকারি প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য কৃষকদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা এবং মানসম্মত বীজ উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে পেঁয়াজ বীজ চাষ সম্প্রসারণ করা যাবে, যা স্থানীয় কৃষি খাতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বাড়াবে।
ইতোমধ্যে এই খেত ঘিরেই এলাকায় তৈরি হয়েছে নতুন আশাবাদ। কৃষি বিভাগের সহায়তা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই খানসামা অঞ্চলে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন একটি সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোগ হিসেবে জায়গা করে নেবে—এমনটাই আশা করছেন স্থানীয়রা।

