

ভোটকেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ থাকলে তবেই ভোট দিতে যাবেন উত্তরের শ্রমজীবীরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার মধ্যে সাত জেলায় সরেজমিনে ঘুরে শ্রমজীবীদের এমন মনোভাব জানা গেছে।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ৩৯টি আসনে ভোটের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। প্রচারণা ও রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা কাটেনি।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না—উত্তরের সাতটি জেলার শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের এমন মনোভাব জানা গেছে।
রাজশাহী : রাজশাহীর শ্রমজীবী সাধারণ ভোটাররা বলছেন, সারা দেশে ভোট ঘিরে একের পর এক সংঘর্ষ ও হানাহানির ঘটনায় তাঁরা শঙ্কিত। এ কারণে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে তাঁরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না।
রাজশাহী নগরীর চায়ের দোকানি সজল ইসলাম বলেন, ‘ভোট দিতে যাব কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।
৫ আগস্টের পর দেশে শান্তি আসবে ভেবেছিলাম; কিন্তু তা হয়নি। বরং মারামারি ও হানাহানি বেড়েছে। ভোটের দিন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকবে, এর নিশ্চয়তা কে দেবে?’
রিকশাচালক শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘ভোট আদৌ হবে কি না, জানি না। মানুষ নানা কথা বলছে।
পান দোকানি বাবু বলেন, ‘ভোট দিতে যাব কি না, এখনো বুঝতে পারছি না। দেশের অবস্থা ভালো না। আমরা খেটে খাই। ভোট দিতে গিয়ে যদি কিছু হয়, সংসার চলবে কিভাবে? পরিস্থিতি ভালো মনে হলে যাব।
দেশের জন্য তো ভোট দেওয়া দরকার।’
পাবনা : পাবনায় বেশির ভাগ শ্রমজীবী ভোটার মনে করছেন, এবার ভোটকেন্দ্র তুলনামূলকভাবে ঝামেলামুক্ত থাকতে পারে। তবে কোনো ধরনের
সহিংসতার শঙ্কা তৈরি হলে তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না বলে জানিয়েছেন।
পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছা এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম মাহমুদ বলেন, ‘সুষুম ভোট হবে—এই আশা করছি। ভালো পরিবেশ চাই। যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেব। তবে পরিবেশ খারাপ হলে ভোটকেন্দ্রে যাব না।’
পাবনা সদর আসনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার, ফুটপাতের দোকানি মো. সুজন হোসেন বলেন, ‘গরিব ও মেহনতি মানুষের পাশে থাকবে—এমন সৎ ও যোগ্য প্রার্থী চাই। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চাই।’
নাটোর : নাটোরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহরের চা দোকানি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত সংসদ নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারিনি। এবার সুষুম পরিবেশ থাকলে ভোটকেন্দ্রে যাব, না হলে যাব না।’
আরেক চা দোকানি আব্দুল হালিম বলেন, ‘চা বিক্রি করেই আমাদের জীবন চলে। কে নেতা হলো, তাতে তেমন কিছু আসে-যায় না। তবু পরিবেশ ভালো থাকলে ভোট দিতে যাব। কিন্তু উত্তেজনা বা সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলে কেন্দ্রে যাব না।’
এ বিষয়ে জেলা রিটার্নিং অফিসার আসমা শাহীন বলেন, ‘দু-একটি ছোটখাটো ঘটনা ছাড়া জেলায় বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সুষুম পরিবেশ নিশ্চিত করতে তৎপর। যেকোনো মূল্যে আমরা সুষুম নির্বাচন উপহার দেব।’
জয়পুরহাট : জয়পুরহাট শহরের আমতলী এলাকার দোকানকর্মী আব্দুল আলিম বলেন, ‘ভোট দিতে চাই ঠিকই; কিন্তু ভোটের পরিবেশ নেই। ভোটকেন্দ্রে আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে? আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। এই জীবনটাই আমাদের সম্বল। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ভোট দিতে যাব, আর পরিবেশ ভালো না হলে কেন্দ্রে যাব না।’
শহরের পাঁচুর মোড় এলাকার ভ্যানশ্রমিক শাহাদত হোসেন বলেন, ‘ভোটের যে আনন্দ থাকার কথা, সেটা এবার পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে সেনাবাহিনী, বিজিবি আর পুলিশ ঘুরলে কী হবে, ভয় তো কাটছে না। চারদিকে শুধু গণ্ডগোলের খবর। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ভোট কি আদৌ হবে?’
ভোটের পরিবেশ নিয়ে এমন শঙ্কার কথা জানান আরো অনেক শ্রমজীবী ভোটার। তাঁদের ভাষ্য, আগের মতো উৎসবমুখর পরিবেশ এবার দেখা যাচ্ছে না। প্রার্থী ও তাঁদের নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই। বরং ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে ভয় ও উৎকণ্ঠাই বেশি কাজ করছে।
এ বিষয়ে জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. আল মামুন মিয়া বলেন, ‘জয়পুরহাটের দুটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটাররা যেন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
নওগাঁ : ইজি বাইকচালক সুজিত বলেন, ‘সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বের হই। রাত অবধি বাইক চালাই। যতক্ষণ বাইকের ব্যাটারিতে চার্জ থাকে. ততক্ষণ চালিয়ে যাই। কাজ করলে খেতে পাই, না করলে নাই। ভোট দিতে গিয়ে মারামারির মধ্যে আমার ক্ষতি হলে তখন কে দেখবে? তাই ভোটের পরিবেশ ভালো না হলে যাবই না কেন্দ্রে।’
নওগাঁ পৌর শহরের কাঁচাবাজারের রাস্তার ধারে মৌসুমি ফলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান বলেন, ‘অনেক দিন পর এবার নিজের খুশিমতো ভোট দিব, কিন্তু ভোট কি হবে? ভোটের দিন কোনো ঝামেলা হলে তো ভোট দিতেই যাব না।’
সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের টুকরা ছোনগাছা গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক হাসান আলী (২৫) বলেন, ‘সব কিছু দেখছি। কাকে ভোট দেব, এখনো নিয়ত করিনি। তবে যদি পরিবেশ ভালো থাকে, ভোট দিতে কেন্দ্রে যাব।’
সিরাজগঞ্জ শহরে দুধ বিক্রি করেন রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামের করিম বক্সের ছেলে কেরামত আলী (৬০)। ভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভোট দিতে কেন্দ্রে যাব। আমি দেশের নাগরিক, কেন ভোট দেব না। তবে এবারের ভোটে তেমন আমেজ নেই।
সুত্র: কালের কন্ঠ

