

শিব ব্রত চক্রবর্ত্তী, পরশুরাম (ফেনী) প্রতিনিধি: পরশুরাম উপজেলায় জেল-জরিমানা করেও থামানো যাচ্ছে না তিন ফসলি জমির (কৃষি জমি) মাটি কাটা। আবাদি জমি ও নদী এবং নদীর পার থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি যাচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটা ও খালি জমি ভরাটের জন্য। জমির উপরের অংশ অর্থাৎ টপ সয়েল ইটভাটা ও জমি ভরাটের জন্য যাওয়ায় জমির উর্বরতা হারাচ্ছে। মাটি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামীতে খাদ্য ঘাটতিসহ ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সচেতনরা। সারাদিন রাত মাটি ভর্তি ভারী ট্রাক চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামের পাকা রাস্তা।
জমির মালিক, ইটভাটা সংশ্লিষ্টরা ও দালালদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পরশুরাম উপজেলা ও আশেপাশের এলাকায় প্রায় ১৫টি ইটভাটা রয়েছে, এদের বেশির ভাগই অনুমোদনবিহীন। এছাড়া রয়েছে জমি ভরাট। এজন্য মাটির চাহিদা মেটাতে এসব ইটভাটার মালিক ও সাধারণ জমির মালিকরা পুরো উপজেলায় কমপক্ষে অর্ধশতাধিক দালাল নিয়োগ দিয়েছেন। কৃষি জমির মালিকদের অতিরিক্ত টাকার প্রলোভন দেখিয়ে মাটি কিনতে দালালদের দেওয়া হয়েছে বিপুল টাকা। প্রশাসন, পুলিশ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করার নামে দালালরা ইটভাটার মালিক ও সাধারণ জমির মালিকদের কাছ থেকে নিয়েছেন অতিরিক্ত টাকা।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, উপজেলার পৌরসভসহ তিনটি ইউনিয়নে কমপক্ষ শতাধিক স্পটে ফসলি জমিতে একযোগে মাটি কাটা হচ্ছে। এসব স্পটে নির্বিঘ্নে মাটি কাটা সম্পন্ন করতে মাটির দালালরা কৌশল হিসেবে বর্তমান সময়ের ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ভাড়া করেছেন। প্রতিটি স্পটে কমপক্ষে একজন করে রাজনৈতিক কর্মী ভাড়া খাটেন। উপজেলা প্রশাসন বা সচেতন মহলের কেউ মাটি কাটায় বাঁধা দিতে আসলে রাজনৈতিক কর্মীরা সামনে আসেন। কোন সংবাদ কর্মী যদি তথ্য সংগ্রহ করতে যায় তাহলে মাটি কাটার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টরা জানিয়ে দেয় যে তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই মাটি কাটছে। আবার মাঝে মাঝে দেখা যায় সিএনজি করে পুলিশ এসে মাটি কাটার স্থানে গিয়ে মাটির দালালদের সাথে কথা বলে আসে।
কয়েকটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, মাটি কাটার স্থানে পুলিশ মূলত আসে টাকা নেওয়ার জন্য। পুলিশ যদি মাটি কাটা থামানোর জন্যই আসে তাহলে পুলিশ দেখে যারা মাটি কাটছে তারা তো পালানোর কথা বা তাৎক্ষণিক মাটি কাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা।
এ ব্যাপারে পরশুরাম থানার অফিসার ইনচার্জ আশরাফুল ইসলাম বলেন, মাটি কেটে যে রাস্তা গুলো দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ওই রাস্তা গুলো ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। এবং কোন পুলিশ সদস্য যদি এভাবে মাটি কাটার স্থানে গিয়ে টাকা নেয় এই জাতীয় তথ্য যদি পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফসলি জমিতে মাটি কাটা বন্ধে উপজেলা প্রশাসন যখনই পুলিশের সহযোগিতা চাইবে আমরা প্রস্তুত রয়েছি বলেও জানান ওই অফিসার ইনচার্জ। তবে সরজমিনে ঘুরে পরশুরাম থানার অফিসার ইনচার্জ এর বক্তব্যের সাথে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় নি।
পরশুরাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, মাটি বিক্রি করায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটিতে যে জৈব পদার্থ থাকে তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া মাটিতে যে জীবাণু থাকে এবং অণুজীবের কার্যাবলী আছে তা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। এতে করে দিন দিন ফসলি জমিতে উৎপাদন ক্ষমতা কমছে। মাটির জৈব শক্তি কমে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে। আর এভাবে ফসলি জমির মাটি ইটভাটা সহ অন্যান্য জায়গার যেতে থাকলে ক্রমান্বয়ে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং লক্ষ্যমাত্রার ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে।
পরশুরাম উপজেলা এসিল্যান্ড এস এম শাফায়েত আকতার নূর বলেন, কৃষি জমিতে মাটি কাটা ও বালি উত্তোলন বন্ধে এই উপজেলায় গত দুইমাসে কমপক্ষে ১০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। নীতিমালা লঙ্গন করায় মোবাইল কোর্টে কয়েকজন মাটি ব্যবসায়ীকে ভুমি আইনে শাস্তি সহ হয়েছে জরিমানা করা হয়েছে। বালু ও মাটি উত্তোলনে ব্যবহৃত এস্কেভেটর জব্দ করা হয়েছে। সুর্নিদিষ্ট তথ্য পেলে সাথে সাথে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এলাকার সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাত-দিন ধরে নির্বিঘ্নে এবং নির্বিচারে মাটি কাটা একটা প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে একদিকে যেমন ফসলি জমির ক্ষতি হচ্ছে অপরদিকে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়কগুলো। রাতদিন মাটিভর্তি ট্রাক চলাচলে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে সড়ক গুলো। তাছাড়া ট্রাক থেকে মাটি পড়ে রাস্তায় মাটির আস্তরন সৃষ্টি হয়েছে। সামনে বৃষ্টির মৌসুমে একটু বৃষ্টি হলেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এত অভিযান ও জরিমানার পরেও থামছে না ফসলি জমির মাটি কাটা।
