ঢাকা
২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
দুপুর ২:০৬
logo
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

ঝুট কম্বল তৈরি করে স্বাবলম্বী কাজিপুরের পঁচিশ হাজার নারী

আবদুল জলিল, কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: শীতের শুরু থেকে ওমিছা, সাঈদা, রেহানা, আচফুল, সুকবালা, ছামিরণ, শেফালি, রেজিয়ারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। সেলাই মেশিনের প্যাডেলের গতির সাথে বাড়ছে তাদের যাপিত জীবনের সমৃদ্ধির চাকা। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার ছালাভরা, শিমুলদাইড়, সাতকয়া, বর্শিভাভাঙ্গা,গাড়াবেড়, কুনকুনিয়া, শ্যামপুর, ঢেকুরিয়াসহ উপজেলার ২৫ টি গ্রামের ২৫ হাজার বিভিন্ন বয়সী নারীদের প্রতিদিনকার এই কাজের পিছনে একটি কমন গল্প রয়েছে। সংসারে পুরুষের পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান জানান দেয়া এবং স্বাবলম্বীতার পথে ভূমিকা রাখা সেই গল্পের কমন শিরোণাম। এতে করে সংসারে পূর্বের চেয়ে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকখানি। এখন তারা সমাজ সংসারের বোঝা নয়। তবে এই কমন গল্পের পিছনের গল্পটি অবশ্য প্রত্যেকের আলাদা। তবে শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের সবারই হাতে অথবা পায়ে চালিত সেলাই মেশিনের চাকা ঘোরে সমানতালে। অতীত ভুলে মেশিনের প্রতিটি সেলাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের জীবনের সমৃদ্ধির গল্প নিজেদের মতো করে রচনা করছেন। যার যত পরিশ্রম সমৃদ্ধির সিঁড়ি তার ততো বেশি চওড়া।

পলাশপুরের সাঈদা বেগম। তিরিশ বছর পূর্বে সর্বগ্রাসী যমুনার ভাঙন তান্ডবের শিকার হয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে শিমুলদাই গ্রামের এসে দুই শতক জমি কিনে কোনমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পান। কিন্তু এক বছরে ধানী চারবিঘা জমি বাড়ির ভিটেমাটি আর পুকুর, পালান জমি হারিয়ে তার সংসারে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। এক সময়ের সমৃদ্ধ কৃষক স্বামী তার অন্যের জমিতে কাজের সন্ধানে যান। কোনদিন পান আবার খালি হাতেও ফিরে আসেন অনেকদিন। ঘরে তাদের তিন সন্তান। এই কঠিন সময়ে স্বামীর পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে প্রতিবেশিদের দেখাদেখি নিজে সেলাই মেশিন চালানো শিখে শুরু করেন ঝুট জোড়াতালি দিয়ে কম্বল তৈরির কাজ। সকালে দিনের রান্না একেবারে শেষ করে শুরু করেন সেলাইয়ের কাজ। আর বেশ খানিকটা রাত হলে থামে তার মেশিনের চাকা। এভাবে প্রতিদিন তার একশ থেকে দেড়শ টাকা আসতে লাগলো। সংসারের ভঙ্গুর চাকাও বেশ ঘুরতে শুরু করলো। এমনি করে দিনের পর দিন মজুরি বাড়তে থাকে। টাকাও আসে প্রচুর। এখন তিনি আধা পাকা বাড়িতে থাকেন। দুই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি দুই ছেলের বউকে নিয়ে সেলাইয়ের কাজ করছেন। দিনে তাদের উপার্জন এখন প্রতিজনের দুইশ থেকে চারশ টাকা পর্যন্ত।

বর্শিভাঙ্গা গ্রামের জমিরনের রিক্সা শ্রমিক স্বামীর একার আয়ে চলা কঠিন। দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। মেয়েটাকে এবার স্কুলে ভর্তি করাতে হবে, অনেক খরচ। তাই স্বামীকে সহায়তা করতে বছরের আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করেন ঝুট থেকে কম্বল তৈরির কাজে। এতে করে মাসে তার দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকায় তার সন্তানেরা ভালোভাবে স্কুলে পড়ছে।

গাড়াবেড় গ্রামের সেকান্দার-সেলিনা দম্পতির গল্পটি অবশ্য অন্যদের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। জীবনের চাকা সচল রাখতে দিনে তিনি একা বিভিন্ন জলাশয় থেকে মাছ ধরতেন। আর সন্ধ্যা নামলে মাঝে মাঝে তার স্ত্রী অথবা তার সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে মাছ ধরার কাজে সহায়তা করতেন। তাই দিয়ে কোনমতে চলতো তাদের সংসার।

দশ বছর আগের কথা। একদিন প্রতিবেশির সহায়তার নিজের বাড়িতে ঝুট কাপড় নিয়ে আসেন। একটা সেলাই মেশিন জোগাড় করে শুরু করেন কম্বল তৈরির কাজ। প্রথম বছরেই তারা বেশকিছু টাকা বাড়তি আয় করেন। এদিকে বাবা মায়ের এই সংগ্রাম দেখে তার স্কুল পড়ুয়া ছেলেটির মাঝে আসে পরিবর্তন। একদিন সেও সিদ্ধান্ত নেয় মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে। তার অশিক্ষিত পিতামাতা তো তাকে পড়ার বিষয়ে কিছু বোঝাতে পারেন না। তাই নিজে থেকেই সে স্থানীয় বিদ্যালয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ালেখা শুরু করে। এভাবে সে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে পাশ করে এখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে তাদের ঝুপড়ি ঘরের জায়গায় আধাপাকা টিনের ঘর উঠেছে। যাপিত জীবনে এসেছে পরিবর্তন।

কাজিপুরের কমপক্ষে তিন থেকে চার হাজার স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রীও ঝুট কম্বল শিল্পের সাথে জড়িত। তারা বিদ্যালয়ের ফাঁকে ফাঁকে মায়েদের সাথে নিজেরাও কম্বল তৈরির কাজ করে। এতে করে তারা নিজেরাই প্রাইভেট টিউশন থেকে শুর করে জামা কাপড়, কসমেটিক কেনার অর্থ উপার্জন করে। তাদের অনেকেই স্থানীয় ব্যাংকে হিসেব খুলে কিছু কিছু টাকা জমিয়ে রাখছে। শিমুলদাইড় উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী জয়িতা খাতুন জানান, আমার মা কম্বল সেলাইয়ের কাজ করেন। তার দেখাদেখি আমিও স্কুল থেকে গিয়ে এই কাজ করি। মা আমার টাকা সংসারের কাজে নেন না। আমি তা ব্যাংকে জমিয়ে রাখি আর নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনি।

এমনি করে কাজিপুরের সব নারীর গল্প আলাদা হলেও নিজেদের জীবনের সংগ্রামী ইনিংসটাকে এগিয়ে নিতে তাদের ভরসা জোগাচ্ছে ঝুট কম্বল শিল্প। উপজেলার শিমুলদাইড় বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এই ঝুট পল্লী। এই কাজের মাধ্যমে এলাকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। এককালের ছনের ঘর বিদায় নিয়েছে এই এলাকা থেকে এক সময়ের ভিক্ষার এখন কর্মের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

তবে এই শিল্পের শুরুটা হয়েছিলো তিন যুগ আগে। বিকল্প উপার্জনের পথ বাছতেই একদিন বড়শীভাঙ্গার ছাইদুল হক চলে যান ঢাকার মিরপুরে। তার পছন্দের তালিকায় চলে আসে ঝুটকাপড় কিনে এনে তা সেলাই করে তৈরি করেন কম্বল। সাইকেলের পেছনে তুলে বিক্রি শুরু হয় গ্রামে গ্রামে। হাতে আসে অনেক টাকা। বদলাতে থাকে ছাইদুলের জীবন। এমনি করে হাজী জিয়া, চান মিয়া, ইছানুর রহমানরা শুরু করেন এই ব্যবসা। এরপর ২০১৪ সালে শরিফ সোহেল এই ব্যবসায় আসলে দ্রুত পাল্টে যায় ব্যবসার ধরণ। তিনি একে একে কম্বলের ধরণ বাড়াতে থাকেন। তারপর থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি এ তল্লাটের মানুষের।

শরিফ সোহেল জানান, কাজিপুরের এই ঝুট পল্লীতে শুরুতে শুধুমাত্র জোড়া কম্বল তৈরি হলেও সময়ের সাথে সাথে পাল্টেছে এর ধরণ। এখন শিশু পোশাকসহ ১৬১ প্রকারের কম্বল প্রস্তুত হচ্ছে। সরাসরি চায়না থেকে কম্বল এখানে আসছে। সেইসাথে গতবার থেকে আমি কম্বল তৈরির কারখানা চালু করেছি। তবে পুরুষের পাশাপাশি এলাকার কমপক্ষে পঁচিশ হাজার নারী এই কাজের সাথে জড়িত। এখন সংসারের সিদ্ধান্ত নিতে পুরষের পাশাপাশি এই নারীদের ভূমিকাও চোখে পড়ার মতো।

কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “সারাদেশে শিমুলদাইড় বাজারের নাম ছড়িয়ে পড়েছে ঝুটশিল্পের কারণে। ঝামেলামুক্ত পরিবেশে শ্রমিকেরা এখানে কাজ করছেন দিনরাত। জেনেছি এই শিল্পের শ্রমিকদের অর্ধেকের মতো নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এতে করে সংসারে তাদের আলাদা একটা মর্যাদা এখন স্বীকৃত। এমনি করে প্রতিটি পরিবারেরই এখন সমৃদ্ধির একটি কমন গল্প রয়েছে।”

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram