

স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা: দেশের প্রাচীন রেল স্টেশন গুলোর মধ্যে অন্যতম কুমিল্লা রেল স্টেশনে সমস্যার কোন অন্ত নেই। নানা সমস্যায় জর্জরিত এই স্টেশনের সমাধানের আশ্বাস দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সোমবার সকালে সরেজমিনে কুমিল্লা রেলস্টেশন ঘুরে ও যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এর সার্বিক চালচিত্র।
দেখা যায়, কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনকে ঘিরে দিনের পর দিন বাড়ছে দোকানপাট, হকার, সিএনজি-অটো স্ট্যান্ড, ছিনতাই ও প্লাটফর্মে মারামারির মত ঘটনা। সেই ধারাবাহিকতায় হচ্ছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি। অপরদিকে হচ্ছে না কোন উন্নয়ন। ঘুরছে না যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত পাখা, প্রয়োজনের তুলনায় নেই বিশ্রামাগার ব্যবস্থা। বন্ধ থাকে প্রথম শ্রেণি ও ভিআইপি বিশ্রামাগার। সুপেয় পানির নেই ব্যবস্থা। নিয়মিত পাওয়া যায় না নিরাপত্তা কর্মীদের। অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় রেলওয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষের। সেই সাথে প্রায়ই যোগ হচ্ছে ট্রেনের বিলম্ব ভোগান্তি। রবি'র পক্ষ থেকে পানির ব্যবস্থা করলেও সেটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেই। যদিও স্টেশন মাষ্টার দাবি করেন, তিনি নিজেও এটার পানি পান করেন।
সোমবার দুপুর ১১ টায় সরেজমিনে দেখা যায়, স্টেশনে যাত্রীদের প্রচন্ড ভীড়। ট্রেন আসতে অনেক বিলম্ব হওয়াতে সবাই অপেক্ষমান। এমতাবস্থায় প্লাটফর্মের একপাশে ফ্যান বন্ধ এবং অন্যপাশে চালু আছে। তীব্র এই গরমে পাখা বন্ধ থাকায় যাত্রীরা ভোগছেন অসহ্য গরমের যন্ত্রণায়। জানতে চাইলে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা জানান, এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মে এখন যাত্রীদের ভীড় বেশি, দুই নাম্বারে যাত্রী কম থাকায় ফ্যান বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্ত এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের এক পাশের ফ্যানগুলা বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি দোষ চাপিয়ে দিলেন রেলওয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে।
এদিকে প্রথম শ্রেণি ও ভিআইপি যাত্রীদের বিশ্রামাগার বন্ধ রাখার ফলে চাপ বাড়ছে দ্বিতীয় শ্রেণির বিশ্রামাগার কক্ষে। যা যাত্রীদের তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত। তবে প্রথম শ্রেণির টিকেট দেখালে খুলে দেওয়া হয় বলে জানান স্টেশন মাষ্টার। কিন্তু বাস্তবে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি যাত্রীদের সাথে কথা বলে।
স্টেশনকে ঘিরে নানা মুখী মানুষের কর্মক্ষেত্র তৈরি হলেও এটি বাস্তবে নিয়মের বাইরে এবং অবৈধ। নির্দিষ্ট কিছু চাঁদা দিয়ে এসব ব্যাবসা পরিচালনা করলেও ৫ আগস্টের পরে আর কোন চাঁদা দিতে হয় না। তবে এগুলোকে প্রতিদিন সরে যেতে চাপ দেন স্টেশন মাষ্টার ও দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। তারপরেও জীবিকার চাহিদায় ভাসমান ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন প্ল্যাটফর্মে।
স্টেশনের ভিতরে এবং বাইরে সারি সারি দোকান গড়ে উঠেছে, যা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ হতে ইজারা দেওয়া হয়। কিন্ত সেই টাকা থেকে যাত্রীদের সুবিধার্থে সুপেয় পানি কিংবা পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে স্টেশনের সামনে লম্বা করে সাজানো থাকে সিএনজি-অটো-মিশোক পরিবহন। ট্রেন আসার সময় হলে তাদের উপস্থিতি বেড়ে যায় কয়েক গুন। তবে নির্দিষ্ট কোন ভাড়ার তালিকা না থাকায় যাত্রীরা পড়েন নানা বিরম্বনায়। মানুষজন বেশি থাকলে কিংবা আবহাওয়া খারাপ থাকলে বেড়ে যায় ভাড়ার পরিমাণও।
আখাউড়া থেকে প্রায়ই ট্রেনে করে কুমিল্লায় আসেন রমিজ উদদীন। তিনি জানান, ট্রেন থেকে নামার পর রিক্সা, অটোর অভাব হয় না। কিন্ত যাত্রী বেশি হয়ে গেলে বাধে বিপত্তি। তখন সবাই ই বেশি বেশি ভাড়া চায়। সেক্ষেত্রে প্রশাসন থেকে সকল রাস্তায় ভাড়া নির্ধারিত করে দিলে আমাদের জন্য উপকার হতো।
স্টেশনকে ঘিরে সবসময় সজাগ থাকে নানা রকম ছিনতাই চক্র। এই চক্রের কারণেই আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে এখানে। কারো কারো আবার অভিযোগের তীর রেলওয়ে পুলিশের দিকেও।
কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে বাড়ছে কিশোর গ্যাং ও টোকাইয়ের সংখ্যা। যারা সামান্য বিষয়ে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে ফেলে নির্দ্বিধায়। তাদের বিষয়ে পুলিশের জরুরি ব্যবস্থা ও জনগণের সতর্কতা অবলম্বন খুব জরুরি বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন মাষ্টার মোঃ আনোয়ারুল হক বলেন, সবসময় পাখা চালিয়ে রাখলে বিদ্যুতের অপচয় হয়। তাই প্রয়োজন বুঝে এগুলা চালু রাখি। বিশ্রামাগার আলাদা আলাদা পদমর্যাদায় ভাগ করা। তাই সবার জন্য সবগুলা উন্মুক্ত করে দেওয়া ঠিক না। যদি আমাদের কোন বাজেট আসে পাবলিক টয়লেট ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার, তাহলে আমরা সেটি করব। তবে এখন যেটি আছে সেখানের পানিও নিরাপদ এবং আমরা সবাই সেই পানি পান করি।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়সার বলেন, স্টেশনে পুলিশ সবসময় মানুষের যাত্রায় নিরাপত্তা দিতে কাজ করছে। তারপরেও যদি কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, আমাদের কাছে অভিযোগ আসলে আমরা সে বিষয়ে পদক্ষেও নিব।
এ বিষয়ে কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে দায়িত্বরত পুলিশের উপ-পরিদর্শক সোহেল আহমেদ বলেন, আমরা সবসময় স্টেশনের সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তায় কাজ করি। বিভিন্ন সময়ে সিভিল ড্রেসেও ঘোরাফেরা করি যেন অপরাধীদের ধরতে পারি। তবে মানুষকেও সবসময় সচেতন থাকতে হবে।
