

মো. মোকাররম হোসাইন, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের কালাইয়ে শিমুলতলী আরবি স্পেশালাইজড স্টোরেজে ৫০ বস্তা আলু রেখেছেন হাতিয়র গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম। দাম কম থাকায় এখনও বিক্রি করেননি তিনি। এ আলু মৌসুমে বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। চার মাস পরও ৬৫ কেজির এক বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৬২০ থেকে ৬৩০ টাকায়। এ দামে আলু বিক্রি করলে ৫০ বস্তায় ৫০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমন ধান রোপণের খরচ জোগাতেই তিনি হিমাগারে আলু রেখেছিলেন। শুধু তিনিই না, বিপদে আছেন তাঁর মতো অনেক কৃষক।
কৃষকের মতো ব্যবসায়ী এবং হিমাগার মালিকরাও উদ্বেগে দিন পার করছেন। তারা বলছেন, প্রতিদিন আলুর দাম কমছে। ফলে মূলধন হারাচ্ছেন। এখন এক বস্তা (৬৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকায়। হিমাগার ভাড়া বাদে কৃষক পাচ্ছেন মাত্র ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে ছিল ৭২০ টাকা বস্তা। চলতি সপ্তাহে গড়ে ৬২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আলু কিনে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বেচাকেনাও ধীরগতিতে চলছে। ফলে হিমাগারে মজুদ কমছে না। গত বছর এমন সময়ে মজুদের অর্ধেক বিক্রি হলেও এবার ৮ শতাংশেরও কম বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে আলু নিয়ে বিপদে আছেন হিমাগার মালিকরাও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এবার ৪৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার টন। জেলায় চাহিদা ৫০ হাজার টন। আর ২১টি হিমাগারে দুই লাখ ছয় হাজার টন সংরক্ষণ হয়েছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় মৌসুমের শুরু থেকেই আশানুরূপ দাম পাননি কৃষক। আগের বছর সবাই লাভবান হয়েছেন। সে কারণে এবারও কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অনেক আলু মজুদ করেছেন।
হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৬৫ কেজির পরিবহন-শ্রমিকসহ এক বস্তায় খরচ হয়েছে এক হাজার থেকে ১১শ টাকা পর্যন্ত। সংরক্ষণের চার মাস পর ৬২০ থেকে ৬৩০ টাকায় বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের লোকসান ৮৮০ থেকে ৯০০ টাকা। আর কৃষক সব খরচ বাদে বস্তায় ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা কম থাকায় পাইকারি বাজারে দাম কমছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কৃষক ভাড়াও দিতে পারবেন না। দাম কম জেনে তারা বিক্রি করতেও আসছেন না। মজুদ বেশি থাকায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন হিমাগার মালিকরা।
কালাই উপজেলার কৃষক শাহীন বলেন, লাভের আশায় ১০০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। চার মাস পর বিক্রি করে পেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। হিমাগারে রাখার সময় খালি বস্তা ৮০ টাকা, প্যাকেট করে ওজন ও সুতলি বাবদ ৩৫ টাকা ও পৌঁছানোর খরচ হয়েছে ৫০ টাকা। সব মিলিয়ে বস্তায় ১৬৫ টাকা করে আগেই খরচ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগের খরচ বাদে ১০০ বস্তা আলু বিক্রি করে মাত্র সাড়ে ৫ হাজার টাকা পেয়েছি। অথচ মৌসুমে বিক্রি করলে পাওয়া যেত ৬০ হাজার টাকা। আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে।’
পুনট বাজারের ব্যবসায়ী মিঠু ফকির বলেন, ‘আলুর দাম বেশি হলে সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির লোক কমানোর চাপ দিয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের হেনস্তা করেন। এবার দাম বাড়ানো নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।’ আরেক ব্যবসায়ী বেলাল হোসেনের ভাষ্য, ‘বস্তাপ্রতি ৬২৫ টাকা দরে ৩০০ বস্তা আলু কিনেছি। কুমিল্লার পাইকারি বাজারে পাঠাব। কিন্তু মহাজন বলছেন, দাম কমে গেছে। কাঁচামাল বাইরে রাখাও সম্ভব নয়। লোকসান হলেও বিক্রি করতেই হবে। কৃষকের মতো আমরাও বিপদে আছি।’
দাম না থাকায় কৃষক হিমাগারে আলু নিতে আসছেন না জানিয়ে পুনট হিমাগারের ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার বলেন, ‘এবার ক্রয়-বিক্রয়ের চিত্র উল্টো। ব্যবসায়ীরা বেকার সময় কাটাচ্ছেন। গত বছর এ সময়ে অর্ধেকেরও বেশি আলু হিমাগার থেকে বের হয়েছে। অথচ এবার বের হয়েছে ৭ থেকে ৮ শতাংশ। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সব বের হবে কিনা, তা নিয়ে মালিকরা দুশ্চিন্তায় আছেন।’
কৃষকের ক্ষতির কথা স্বীকার করে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, কৃষক ও কৃষি বাঁচাতে সরকার এ বিষয়ে দৃষ্টি দেবে।’ এ পর্যন্ত ১৩ হাজার টন আলু বিক্রি হয়েছে জানিয়ে জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রাহেলা পারভিন বলেন, ‘২১ হিমাগারে দুই লাখ ছয় হাজার টন আলু মজুদ আছে। দাম না থাকায় হিমাগারে বিক্রি কম হচ্ছে।’
