ঢাকা
৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১১:২২
logo
প্রকাশিত : মার্চ ৯, ২০২৫

৩০ জেলায় শিশুর টিকা সংকট

দেশের বিভিন্ন জেলায় গত জানুয়ারি মাস থেকে শিশুদের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ সংকট এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এতে শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় জন্মের পর থেকে ২৩ মাস বয়সের মধ্যে শিশুদের ১০টি বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক এই টিকা দেওয়া হয়।

সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে টিকা না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন শিশুদের মা ও স্বজনরা। এসব অভিভাবক জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিশুদের টিকা দিতে না পারায় তাঁরা উদ্বিগ্ন।

গত বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, টিকা না থাকায় শিশুদের মা ও স্বজনরা ফেরত যাচ্ছেন।

তাঁদের একজন দাউদকান্দি পৌর এলাকার তাছলিমা আক্তার জানান, গত এক মাসে এভাবে চারবার টিকা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন রেজা মো. সারোয়ার আকবর বলেন, কুমিল্লায় এমআর ও টিডি ভ্যাকসিন কিছু থাকলেও তা একেবারেই অল্প। এ ছাড়া জেলায় আর কোনো ভ্যাকসিন নেই।

জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও ইপিআই সূত্রে কুমিল্লার মতো এমন ৩০ জেলায় টিকা সংকটের তথ্য জানা গেছে।

এসব জেলার মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর, মেহেরপুর, পিরোজপুর, গাজীপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, খুলনা, ভোলা, বরগুনা, নেত্রকোনা, বাগেরহাট, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, পটুয়াখালী, নড়াইল, টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, নরসিংদী, রাজবাড়ী, যশোর, ঝিনাইদহ ও বরিশাল।

টিকার সংকটের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইপিআই প্রগ্রাম ম্যানেজারের ভাষ্য, টিকার সংকট হওয়ার কারণ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, ‘সংকট আগে ছিল, এখন হয়তো পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। অপারেশন প্ল্যান (ওপি) না থাকায় আমরা রাজস্ব খাত থেকে ৪৬২ কোটি টাকার টিকা কিনেছি।

সুতরাং টিকার সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই। আশা করছি, খুব শিগগিরই সব জেলায় টিকা পৌঁছে যাবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার দীর্ঘ বিরতিতে শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়লে রোগের নতুন করে প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। এ ঘটনা এর আগেও ঘটে চট্টগ্রামে। সেখানে একটি এলাকায় হামের টিকা না দেওয়ায় অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিশুরা যখন বাংলাদেশে আসে, তখন ব্যাপক আকারে ডিপথেরিয়া দেখা দেয়। কারণ এসব শিশু মায়ানমারে বসবাসের সময় টিকা পায়নি।

কিশোরগঞ্জ : এক সপ্তাহ ধরে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের মজুদখানায় গুরুত্বপূর্ণ আট ধরনের টিকা একেবারে শূন্যের কোঠায়। কেবল আইপিভি রয়েছে মাত্র ৫০ ভায়াল। এ ছাড়া এমআর রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ভায়াল। সংকট চলছে বিসিজি, প্যান্টা, পিসিভি ও আইপিভি টিকার। উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মীরা মনে করেন, মজুদে থাকা সামান্য আইপিভি টিকা দিয়ে একটি কেন্দ্র এক দিন চালানোও সম্ভব নয়।

শরণখোলা (বাগেরহাট) : বাগেরহাটের শরণখোলায় শিশুদের টিকা সংকট দেখা দিয়েছে। পোলিও, যক্ষ্মা, হামসহ তিন ধরনের টিকা নেই বললেই চলে। জেলার ইপিআই কর্মকর্তা ফরিদ জানান, জেলা হাসপাতালেও টিকা নেই। এতে উপজেলা হাসপাতালে সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিশুদের টিকার সংকট চলছে। দু-একটি কেন্দ্রে সব ধরনের টিকা থাকলেও বাকিগুলোতে নেই। তবে কয়েক দিনের মধ্যে টিকার সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ : প্রায় ছয় মাস ধরে শিশুর টিকাদানে সংকট তৈরি হয়েছে ময়মনসিংহ জেলায়। সময়মতো শিশুরা টিকা পাচ্ছে না। অনেক শিশুর ছয় মাস পার হলেও টিকা পায়নি। দিন দিন এ সংকট আরো বাড়ছে। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দাবি, এ সংকট সারা দেশেই। চলতি মাস থেকে কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে, তবে তা আশানুরূপ নয়।

ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহে ইপিআই এক মাস ধরে বন্ধ। সরবরাহ না থাকায় নবজাতকদের দেওয়া চারটি টিকার মধ্যে দুটির মজুদ ফুরিয়ে গেছে। অভিভাবকরা নবজাতক নিয়ে টিকাকেন্দ্রে এসে ফিরে যাচ্ছেন।

মণিরামপুর (যশোর) : যশোরের মণিরামপুর উপজেলার পল্লীর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে শিশুদের টিকা না পাওয়ায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, শিশুদের টিকা না পেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

লামা (বান্দরবান) : বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার নবজাতক শিশুরা বিভিন্ন সংক্রমণ ব্যাধির টিকা যথাসময়ে পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে অভিভাবকরা সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত।

বাগেরহাট : বাগেরহাটের বিভিন্ন টিকাকেন্দ্রে শিশুদের যক্ষ্মা রোগের বিসিজি এবং পোলিও রোগের ওপিভি ওরাল টিকা শূন্য হয়ে পড়েছে। চাহিদামাফিক সরবরাহ না থাকায় ওই দুই ধরনের টিকার শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে এক মাস ধরে জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে শিশুদের বিসিজি এবং ওপিভি ওরাল টিকা দেওয়া যাচ্ছে না।

টিকা সংকটের তিন কারণ : ইপিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে এক লাখ ৩৪ হাজার আউটরিচ সেন্টারে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এসব টিকাকেন্দ্র সরকারি, বেসরকারি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গ্রামে মূলত সরকারি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শহরে সরকারি টিকাদান কেন্দ্রের পাশাপাশি বেসরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, বেসরকারি হাসপাতাল এবং এনজিওর মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রম চলে।

দেশে শিশুদের জন্য প্রতি মাসে সাত ধরনের ৮৯ লাখ ৪২ হাজার ভ্যাকসিন কিনছে সরকার। ইপিআইয়ের টিকা সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত তিন কারণে শিশুদের টিকা সংকট তৈরি হয়েছে। এক. গাড়ি ও লোকবল সংকট, ওপির কারণে প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া নিয়ে সময়ক্ষেপণ এবং প্রয়োজনের তুলনায় টিকা কম পাওয়া।

বাংলাদেশে সরকার পিসিভি, টিডি, এমআর ও ওপিভি—এই চার ভ্যাকসিন নিজের টাকায় কেনে। পিসিভি ও আইপিভি টিকার কিছু দেয় বৈশ্বিক ভ্যাকসিন সহায়তা প্রগ্রাম কোভ্যাক্সের আওতায় ভ্যাকসিন জোট গ্যাভি। প্রথম সংকট শুরু
গ্যাভি প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন না দেওয়ায়। ৪১ লাখ শিশুর টিকা না দিয়ে গ্যাভি দিচ্ছে ৩৩ লাখ। এই আট লাখ টিকা কম থাকায় সারা বছরই টিকার সংকট থাকে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ইপিআই কর্মসূচি প্রবর্তনের আগে বাংলাদেশে ছয়টি প্রধান প্রাণঘাতি রোগে প্রতিবছর প্রায় ২৫ লাখ শিশু মারা যেত। কিন্তু বর্তমানে সেই মৃত্যুহার কমেছে ৮১.৫ শতাংশ। হাম, পোলিও, ধনুষ্টষ্কারের মতো মারাত্মক রোগ নির্মূল হয়েছে। টিকার দীর্ঘ বিরতিতে এসব রোগ আবার ফিরে আসতে পারে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram