ঢাকা
৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১১:০৭
logo
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১২, ২০২৬

লুটপাট-পাচার বন্ধে হচ্ছে গ্রাহকের ইউনিক আইডি

একই ব্যক্তির নামে একাধিক ব্যাংকে চার-পাঁচ ধরনের হিসাব। কোথাও আসল নাম, কোথাও ভুয়া কিংবা ছদ্মনাম, আবার কোথাও ভিন্ন ঠিকানা। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক মনে হলেও এই ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়েই অনেক সময় অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থপাচার হয়। আর মিথ্যা তথ্যের কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীকে চিহ্নিত করে ঋণ আদায় কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বাড়ে খেলাপি ঋণ, ঝুঁকিতে পড়ে আমানত। এমন অবস্থায় দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে এবার প্রতিটি গ্রাহকের জন্য একক ফাইন্যান্সিয়াল আইডি (ইউএফআইডি) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর আওতায় দেশের সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) এর প্রতিটি গ্রাহকের (ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান) মৌলিক তথ্য একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। ফলে একটি জায়গা থেকেই গ্রাহকের সব ধরনের তথ্য তথা ঋণ ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সব রেকর্ড দেখা যাবে। এতে গ্রাহকের প্রকৃত পরিচয় তথা সুবিধাভোগী শনাক্ত করা সহজ হবে।

এ বিষয়ে বিএফআইইউ থেকে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগসহ অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মূলত ঋণের নামে লুটপাট, অর্থপাচার, করফাঁকি ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধই হবে এ ধরনের কাঠামো গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য। এটি চালু হলে দেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বাড়বে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আর্থিক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, বিএফআইইউ থেকে এই আইডি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের মতামত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মিলবে এবং সন্দেহজনক লেনদেন আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এই উদ্যোগকে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, উদ্যোগটি অবশ্যই ভালো। স্বয়ংক্রিয়ভাবে যদি গ্রাহকের সব তথ্য এক জায়গা থেকে পাওয়া যায়, তাহলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হবে। তবে উদ্যোগ নিয়ে বসে থাকলে হবে না, বাস্তবায়নেও যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপে ব্যাংক খাতের অবস্থা কিছুটা সুরক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্সের আওতায় দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারপরও আর্থিক খাতে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। ফেরত আনা যায়নি নামে-বেনামে লুটপাট হওয়া ও পাচার করা টাকা। এ অবস্থায় অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। সেই সঙ্গে প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করার জটিলতায় ব্যাংক লুটেরা ও তাদের সহায়তাকারী অনেকেই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ব্যাংক খাতে গ্রাহকের ঝুঁকি মূল্যায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ব্যাংকে একই ব্যক্তির একাধিক হিসাব এবং পরিচয় ব্যবহার, জটিল লেনদেন কাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন শনাক্ত করার অসুবিধার কারণে লুটপাট, অর্থপাচার এবং সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া ঋণ ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন ব্যাহত হওয়া এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়। নতুন একক ফাইন্যান্সিয়াল আইডি এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিএফআইইউ বলছে, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে প্রো-অ্যাকটিভ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য একক ফাইন্যান্সিয়াল আইডি সিস্টেম চালু করা গেলে, তা দেশের আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কারণ, তখন গ্রাহকের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ সহজ হবে। সেই সঙ্গে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অর্থ পাচার, সন্ত্রাসী অর্থায়ন, কর ফাঁকি ও আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

অ্যাসোসিয়েন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, গ্রাহকের এফআইডি চালু হলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ধরন আমূল বদলে যাবে। একজন গ্রাহকের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা হিসাব, ঋণ ও আর্থিক আচরণ একসঙ্গে দেখা গেলে ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি মূল্যায়ন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও সহজ হবে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত এফআইডি পোর্টালে প্রতিটি গ্রাহকের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, স্মার্ট কার্ড, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোবাইল নম্বর, টিআইএন ব্যাংক হিসাব ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রাহকের একক আর্থিক পরিচিতি (এফআইডি) তৈরি করা হবে। এ ছাড়া সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস), বীমা, ক্যাপিটাল মার্কেটসহ সব আর্থিক সেবার সঙ্গেও এই পোর্টাল সংযুক্ত করা হবে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) ডেটাবেজে বিদ্যমান ঋণগ্রহীতা আইডি হতে প্রস্তাবিত এফআইডি ভিন্ন হবে। এ ক্ষেত্রে সিআইবির ঋণগ্রহীতা আইডির সঙ্গে এফআইডি সংযুক্ত করে তথ্য ব্যবস্থাপনা করার কথা ভাবা হচ্ছে। ফলে এই পোর্টালের মাধ্যমে গ্রাহকের মৌালিক তথ্য, আর্থিক ঝুঁকির প্রোফাইল ঋণ, একক গ্রাহকের ঋণসীমা, ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত জামানত, সক্রিয় হিসাবের সংখ্যা, গ্রাহকের আর্থিক আচরণসহ সব তথ্য সমন্বিতভাবে দেখা যাবে। এর ফলে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান দ্রুত ঝুঁঁকি মূল্যায়ন করতে পারবে এবং ঋণ অনুমোদন এবং অন্যান্য আর্থিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএফআইইউর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক হিসাব ও পরিচয় থাকার কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, সন্দেহজনক লেনদেন ও জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়ে। প্রস্তাবিত ফাইন্যান্সিয়াল আইডি সিস্টেম এসব ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ধাপে ধাপে প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সমন্বয়ের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।

আরও জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে এ ধরনের আইডি চালু আছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইডির নাম ইউনিফাইড আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ইউআইডি)। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে ফিন্যান্সিয়াল আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (এফআইএন) ও ভারতে আধার নামে ইউনিক আইডি চালু রয়েছে। আর্থিক লেনদেন, কর প্রদানসহ সরকারি বিভিন্ন সুবিধার কাজে এই আইডি ব্যবহৃত হয়।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram