

পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: চেয়ারম্যান নেই। সচিব মারা গিয়েছেন। প্রশাসকের দেখা মিলল না ইউনিয়ন পরিষদে। তালাবন্দি চেয়ারম্যানের ঘর, উদ্যোক্তার কক্ষও। মেম্বারদের হলঘর খোলা থাকলেও নেই কোনও জনপ্রতিনিধি। অথচ বাইরে অপেক্ষায় একের পর এক মানুষ—কারও কলেজে ভর্তি হতে নাগরিকত্ব সনদ দরকার, কারও প্রয়োজন বাবার মৃত্যুসনদ, কেউ আবার ভোটার হওয়ার জন্য এসেছেন প্রত্যয়নপত্র নিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাঁদের।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ৪ নম্বর ভাল্লুকগাছি ইউনিয়ন পরিষদের এই ছবিই এখন কার্যত ‘অভিভাবকহীন’ প্রশাসনের চেহারা তুলে ধরছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, চেয়ারম্যানের কক্ষে ঝুলছে তালা। মেম্বারদের জন্য নির্ধারিত হলঘর খোলা থাকলেও সেখানে কোনও সদস্যকে পাওয়া যায়নি। উদ্যোক্তার ঘরেও তালা। পরিষদের ভিতরে বসে ছিলেন শুধু হিসাব সহকারী ও দু’জন গ্রাম পুলিশ। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
তাঁদের অভিযোগ, শুধু বুধবার নয়, কয়েক দিন ধরেই একই পরিস্থিতি। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র-সহ বিভিন্ন পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। কেউ তিন দিন, কেউ চার দিন ধরে পরিষদে ঘুরছেন। কিন্তু পরিষেবা মিলছে না।
ধোকড়াকুল এলাকার আব্দুল নুরের কথাতেই ধরা পড়েছে সমস্যার গভীরতা। কলেজে ভর্তির জন্য প্রয়োজন নাগরিকত্ব সনদ। সেই সনদের জন্য তিন দিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরছেন তিনি। বুধবারও এসেছিলেন। কিন্তু ফিরে যেতে হল খালি হাতেই।
আব্দুল নুর বলেন, “নাগরিকত্ব সনদ না পেলে কলেজে কী ভাবে ভর্তি হব, সেটাই বুঝতে পারছি না। কবে সনদ পাব, সেটাও কেউ বলতে পারছেন না।”
একই দশা এক ব্যক্তির। বাবার মৃত্যুর সনদ নিতে বেশ কয়েক দিন ধরে পরিষদে আসছেন তিনি। বুধবারও অপেক্ষা করলেন। শেষ পর্যন্ত সনদ না পেয়েই ফিরতে হল।
ভোটার হওয়ার জন্য প্রত্যয়নপত্র ও নাগরিকত্ব সনদ নিতে এসেছিলেন আফসানা মিমি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকেও ফিরতে হয়েছে।
অর্থাৎ, সরকারি পরিষেবা পাওয়ার জন্য যে ইউনিয়ন পরিষদে মানুষের যাওয়ার কথা, সেখানেই এখন পরিষেবা পেতে গিয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে তাঁদের।
ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন পুঠিয়া উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন। তাঁর দাবি, সচিবের মৃত্যুর পরেই কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি কখনও কাউকে হয়রানি করি না। তবে সচিব মারা যাওয়ার পর একটু সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া আজ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিষদে যেতে পারিনি।”
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একজন সচিবের মৃত্যু হলে তাঁর বিকল্প ব্যবস্থা না করে কি দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদের পরিষেবা কার্যত অচল হয়ে থাকতে পারে?
পরিষদে উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। উদ্যোক্তা মিঠুন ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ইউনিয়ন পরিষদে না থাকলেও পরিষদের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।”
বিষয়টি নিয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমানের বক্তব্য, সচিবের মৃত্যুর কারণেই সাধারণ মানুষকে পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সচিবের মৃত্যুর কারণে সেবা পেতে সাধারণদের বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে বিষয়টি অবগত করেছি। দ্রুতই এটার একটি ব্যবস্থা হবে, যাতে করে মানুষ আগের মতো সেবা পেতে পারে।”
প্যানেল চেয়ারম্যান, সদস্য এবং উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ইউএনও বলেন, “আগামীতে সেবা প্রদানকারীরা যাতে উপস্থিত থেকে সেবা দিয়ে থাকেন, সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসের মধ্যে প্রশ্ন একটাই—নতুন সচিব নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ পরিষেবা পাবেন কী ভাবে?
ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্রুত নতুন সচিব নিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসককে নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থেকে পরিষেবা কার্যক্রম তদারক করতে হবে। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে।
নইলে চেয়ারম্যানহীন, সচিবহীন এবং তালাবন্দি দফতরের এই ছবিই আরও কত দিন চলবে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে ভাল্লুকগাছির মানুষের মুখে।
