ঢাকা
logo
প্রকাশিত : October 6, 2026

পাকিস্তানের মানচিত্রে ভারতের গোপন ‘সুপারসনিক’ মিশনের চাঞ্চল্যকর কাহিনি

১৯৯৭ সালের ২৭ মে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের আকাশে হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ।

একের পর এক বিকট আওয়াজে কেঁপে উঠল চারপাশ। অনেক শহরের মানুষ আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো, অনেকে ভেবেছিল বড় কোনো হামলা হয়েছে। পরবর্তীকালে সামনে আসে আসল সত্য। ওটা কোনো বোমা বিস্ফোরণ ছিল না, ছিল শব্দের চেয়ে আড়াই গুণ দ্রুতগামী ভারতীয় বিমানবাহিনীর এক যুদ্ধবিমানের তৈরি করা ‘সনিক বুম’।

পাকিস্তানের সীমানা লঙ্ঘন করে দেশটির ৬৫ হাজার ৬১৭ ফুট (২০ কিলোমিটার) ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল ভারতীয় বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা বিমান ‘মিগ-২৫’, যা ন্যাটোর কাছে পরিচিত ছিল ‘ফক্সব্যাট’ নামে। পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য পুরো বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছিল, ভারতের কোনো বিমান সীমান্ত পার হয়নি। তবে দীর্ঘ বছর পর সেই মিশনের চাঞ্চল্যকর ও রোমাঞ্চকর তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন সে সময় ‘ত্রিশূল’ বা ১০২ স্কোয়াড্রনে কর্মরত সাবেক উইং কমান্ডার প্রদীপ জাসওয়ান্ট (পিজে) ঠাকুর এবং সাবেক এয়ার মার্শাল সুমিত মুখার্জি।

আমেরিকান এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ডের মতোই মিগ-২৫ ছিল বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি সামরিক বিমানের একটি, যা শব্দের চেয়ে তিন গুণ বেশি গতিতে (ম্যাক ৩) উড়তে পারত।

ভারতের বরেলির ১০২ নম্বর স্কোয়াড্রনে এ ধরনের মাত্র ১০টি বিশেষ ‘স্পাই প্লেন’ বা গোয়েন্দা বিমান ছিল। ঘটনার স্মৃতিচারণ করে অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার পিজে ঠাকুর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “গল্পের মূল অংশটি একদম সত্য... আমাদের বিমান সীমান্ত পার হয়ে ওপারে গিয়েছিল। ৬৫ হাজার ফুট উঁচুতে ম্যাক ২.৪ গতিতেই (ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিমি) বিমানটি চলছিল। তবে পাকিস্তান সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সুপারসনিক গতিতে গিয়েছিল এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ, ২০ কিলোমিটার উঁচুতে মিগ-২৫ কখনোই ‘সাবসোনিক’ বা স্বাভাবিক গতিতে উড়তে পারে না, তাহলে বিমান আকাশ থেকে নিচে পড়ে যাবে।

অতি উচ্চতায় দ্রুতগতির কারণেই নিচ থেকে বিকট শব্দ বা সনিক বুম শোনা যায়।”

ঘটনার দিন পাকিস্তান বিমানবাহিনী (পিএএফ) আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী হিসেবে এই বিমানটিকে চিহ্নিত করে এফ-১৬ ফাইটার জেট পাঠিয়েছিল। কিন্তু ফক্সব্যাটের অবিশ্বাস্য গতির কাছে তাদের ইন্টারসেপ্টরগুলো পৌঁছানোর আগেই ভারতীয় বিমানটি তার মিশন শেষ করে বহুদূরে চলে যায়। সাবেক এয়ার মার্শাল সুমিত মুখার্জি বলেন, ‘তখন আকাশে তাদের আটকানোর মতো কেউ ছিল না। ফলে বিষয়টি নিয়ে পরে অনেক গল্প ছড়ায়।’

মিগ-২৫-এর একমাত্র কাজ ছিল শত্রুভাবাপন্ন দেশের স্পর্শকাতর এলাকার সুনির্দিষ্ট ছবি তোলা। বিমানের নাকে বসানো থাকত পাঁচটি সুবিশাল ক্যামেরা। এর মধ্যে চারটি ক্যামেরা দুই পাশে ১০০ কিলোমিটার এলাকার স্পষ্ট ছবি তুলতে পারত এবং পঞ্চম ক্যামেরাটি সোজা নিচের ভূমির সঠিক অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ রেকর্ড করত, যাতে পরে নিখুঁত হামলার পরিকল্পনা করা যায়। সাবেক কর্মকর্তারা জানান, এই ক্যামেরাগুলোর আকার ছিল ঘরের সোফার মতো বড় এবং ফিল্ম রোলগুলো ছিল ৩০ থেকে ৩২ ইঞ্চি চওড়া!

এ ধরনের মিশনগুলো অত্যন্ত গোপন রাখা হতো। এমনকি স্কোয়াড্রনের অন্য পাইলট বা পরিবারের সদস্যরাও টের পেতেন না। ফোনে কোনো নির্দেশের আদান-প্রদান হতো না। স্কোয়াড্রন কমান্ডার সরাসরি হেডকোয়ার্টার্স থেকে মিশন নিয়ে এসে বিশেষ এক বা দুজন পাইলটকে দায়িত্ব দিতেন। আকাশে ওড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অন্য ঘাঁটিগুলোকেও নির্দিষ্ট সময় বলা হতো না।

১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় মিগ-২৫-কে ভারত এক ভিন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকায় ব্যবহার করে। ২০ কিলোমিটার উঁচু থেকে পাহাড়ের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অনুপ্রবেশকারীদের তাঁবু বা বাংকার শনাক্ত করা ছিল অসম্ভব। তাই উইং কমান্ডার পিজে ঠাকুর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাত্র ১০ কিলোমিটার উঁচুতে চলে আসেন, যা ছিল পাহাড়ের চূড়া থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার ওপরে।

সেখানে ম্যাক ০.৯৫ গতিতে উড়ে তিনি লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত ছবি তোলেন। কম উচ্চতায় উড্ডয়নের কারণে মিগ-২৫-এর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ায় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মিগ-২৯ এবং মিরাজ ২০০০ যুদ্ধবিমানকে এর সুরক্ষায় নিয়োজিত করা হয়। এই ছবিগুলোর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে মিরাজ পাইলটরা সফল হামলা চালাতে সক্ষম হন।

১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবর সূর্যগ্রহণ গবেষণার জন্য উদয়পুর সোলার অবজারভেটরির বিজ্ঞানীদের সহায়তায় এক ঐতিহাসিক মিশন পরিচালনা করা হয়েছিল। সুমিত মুখার্জি মিগ-২৫ বিমানে চড়ে ৮০ হাজার ফুট উঁচুতে ম্যাক ২.৫ গতিতে উড়ে সূর্যগ্রহণকে ‘তাড়া’ করেছিলেন। মাটিতে যেখানে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৪২ সেকেন্ড, আকাশে চন্দ্রের ছায়াকে অনুসরণ করে তারা সেটি উপভোগ করেছিলেন ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড ধরে!

তবে সময়ের বিবর্তনে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে মিগ-২৫-এর প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকে। মহাকাশ থেকে যখন সাব-মিটার রেজল্যুশনের নিখুঁত ছবি পাওয়া শুরু হলো, তখন দামি ও জটিল এই বিমানের ওপর নির্ভরতা কমে যায়। দীর্ঘ ২৫ বছর ভারতীয় বিমানবাহিনীকে সেবা দেওয়ার পর ২০০৬ সালের ১ মে চিরতরে অবসরে যায় ঐতিহাসিক ‘ফক্সব্যাট’।

পাইলটদের কাছে কি শত্রুদেশের আকাশে ওড়ার সেই স্মৃতি রোমাঞ্চকর ছিল? উইং কমান্ডার ঠাকুর হেসে উত্তর দেন, ‘আকাশ থেকে সব দেখতে একই রকম লাগে, আলাদা কোনো বর্ডার বা দাগ আঁকা থাকে না। আমরা শুধু নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আসতাম।’

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram