

মো. নজরুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ (অষ্টগ্রাম) প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামে নদী ও জলমহালের ইজারা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র বিরোধ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের আখড়া বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পূর্ব অষ্টগ্রামের আখড়াবাজারে শাহ মোয়াজ্জেম ইয়াকুবের ফার্মেসিতে উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি জাকির হোসেন শফি, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শাহীন, পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ইয়াকুব ও সাধারণ সম্পাদক একছার মিয়া দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বসা ছিলেন; তখন উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাঈদ আহমদের ছেলে সৈয়দ তৌকির আহমেদ, শহীদ ও আফজালের নেতৃত্বে তাঁদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে আক্রমণ চালানো হয়। তখন তারা বাজারের চার-পাঁচটি দোকান হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও ১০-১২ লক্ষ টাকার মালামাল লুটপাট করে। তখন উভয় পক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় জাকির হোসেন শফি ও শাহীন গ্রুপের প্রায় অর্ধশতাধিক লোক আহত হন। পরে অষ্টগ্রাম ইটনা ও মিঠামইন থানার পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আহতদের মধ্যে প্রায় ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের বাজিতপুরের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে; বাকিরা অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক একছার মিয়া অভিযোগ করে বলেন, সৈয়দ সাঈদ আহমদ গুদারার ঘাট, আখড়া বাজারের কাঠমাল বাজার, নদী, জলমহাল এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সবকিছু একাই দখল করে রাখতে চান এবং এ পর্যন্ত তিনি প্রায় দুই কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। একছার মিয়া আরও জানান, ৫/৬ দিন আগে তাঁরা অর্থাৎ এস এম শাহীন, জাকির হোসেন, শফি, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ইয়াকুব এবং তিনি নিজে সরকারি বিধি মোতাবেক টেন্ডারের মাধ্যমে ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে পূর্ব অষ্টগ্রামের 'বিল মাকসা' নদীটি লিজ নিয়েছেন। কিন্তু সৈয়দ সাঈদ আহমদ এই নদী কাউকে ভোগ করতে দেওয়া হবে না এবং কাউকে নদীতে ঢুকতে দেওয়া হবে না মর্মে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন ও মাইকিং করে তার ছেলে তৌকিরের নেতৃত্বে আজকের এ হামলা চালিয়েছেন। বর্তমান এই সংঘর্ষের সম্পূর্ণ দায় তিনি সাঈদ আহমদের ওপর চাপান।
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শাহীন জলমহাল ইজারার প্রক্রিয়া ও আর্থিক হিসেব তুলে ধরে জানান যে, গত বছর জলমহালটি খাস কালেকশনের জন্য নির্ধারিত। গত অর্থ বছরে ৫০ লক্ষ টাকায় লিজ নিয়েও ভৌগোলিক অবস্থান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাঈদ আহমদের জোরপূর্বক দখলের কারণে তা ভোগ করতে পারিনি। এ বছরও জেলা প্রশাসন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর তত্ত্বাবধানে জলমহালটি খাসের নোটিশ দেওয়া হয় এবং ২১ সেপ্টেম্বর টেন্ডার ড্রপ হয়। এস এম শাহীনের দাবি অনুযায়ী, সভাপতির লোক হিসেবে আতিকুর রহমান ৩১ লক্ষ টাকার দরপত্র জমা দিলেও শাহীনের পক্ষের লোক জাহাঙ্গীর ৪০ লক্ষ ১০ হাজার টাকার দরপত্র জমা দেন। শাহীনের মতে, তাঁর পক্ষের দর বেশি হওয়া সত্ত্বেও প্রতিপক্ষ তা মেনে না নিয়ে আজকের এ হামলা ও লুটপাট চালিয়েছেন।
অন্যদিকে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাঈদ আহমদ জানান, বিল মাকসা পূর্ব অষ্টগ্রামের জনগণের সম্পদ। এ নদীতে অন্য ইউনিয়নের কেউ আসলে পূর্ব অষ্টগ্রামের জনগণ তা মেনে নেবে না। তিনি বাজারে লুটপাট এবং মাইকিং করে পূর্বপরিকল্পিত কোনো হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেন, এই সংঘাতে তাঁর পক্ষের কোনো নেতাকর্মী গুরুতর আহত হননি। তিনি আরও জানান, দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের এই বিরোধ মেটাতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিশোরগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট ফজলুর রহমানের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা চলছে।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে, অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান এ প্রতিনিধিকে জানান, প্রথমে আমাদের পুলিশ সেখানে যায়, পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মিঠামইন থানার পুলিশও ঘটনাস্থলে আসে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন থানার পুলিশ রয়েছে এবং এলাকায় থমথমে ভাব বিরাজ করছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
