

আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) সরকারকে প্রতি চার টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকা ধার করে জোগাড় করতে হবে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি পূরণ।
এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন ব্যয় অব্যাহত রাখতে ঋণ প্রয়োজন হলেও রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সরকার বিশাল এ বাজেটে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট দেখিয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণ মূলত দুটি প্রধান উৎসর ওপর নির্ভর করছে।
একটি হচ্ছে—বৈদেশিক উৎস (ঋণ ও অনুদান) থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং আরেকটি হচ্ছে—অভ্যন্তরীণ উৎস (ব্যাংক ও অন্যান্য খাত) থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে বাজেট ঘাটতি সাধারণত সহনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের ঘাটতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘাটতি পূরণে সরকারের ঋণনির্ভরতা ক্রমে বাড়ছে।
তাঁরা আরো বলছেন, ঘাটতি বাজেট নিজে কোনো সমস্যা নয়। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়ই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ঘাটতি বাজেট ব্যবহার করে। প্রশ্ন হলো— সেই ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা থেকে কতটা অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যাবে।
ঋণ কি প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার : অর্থনীতির পাঠ্যবই বলছে, রাষ্ট্র যখন ঋণ নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, সড়ক, রেলপথ, শিল্প অবকাঠামো কিংবা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ করে, তখন সেই বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায়। দেশের ইতিহাসও সেই কথাই বলে।
পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধির সুফল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘ডেট ক্যারিং ক্যাপাসিটি’ বা ঋণ ধারণক্ষমতা। ঋণ নেওয়া কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সেই ঋণের অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয় কিংবা দুর্নীতির কারণে অপচয় হয়। তখন ঋণ উন্নয়নের ইঞ্জিন না হয়ে অর্থনীতির জন্য ফাঁদে পরিণত হয়।
ব্যাংক খাতের ওপর বাড়তি চাপ : ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। এর মধ্যে এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি এখানেই। বর্তমানে ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং উচ্চ সুদহারের চাপে রয়েছে।
এই অবস্থায় সরকার যদি বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব। সরকারি ও বেসরকারি খাত একই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে শিল্প উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বৈদেশিক ঋণের আরেক বাস্তবতা : ঘাটতি অর্থায়নের দ্বিতীয় বড় উৎস বৈদেশিক ঋণ। প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে নিট এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে মোট এক লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ নিলেও এর মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে পুরনো ঋণের কিস্তি ও আসল পরিশোধে। অর্থাৎ নতুন ঋণের একটি বড় অংশ উন্নয়ন ব্যয়ে নয়, বরং পুরনো দায় শোধে চলে যাবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটিই দেশের ঋণচক্রের নতুন বাস্তবতা। কয়েক বছর আগেও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ তুলনামূলক কম ছিল। এখন বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হওয়ায় সেই চাপ দ্রুত বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি নিজে কোনো সমস্যা নয়, যদি তা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।’
সুত্র: কালের কণ্ঠ
