

ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের (বিএটিবিসি) ‘মালিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ বিলিয়ন ডলার’ পাচারের একটি অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমে কোম্পানিটির বিভিন্ন নথি তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এসব নথি ও তথ্য চেয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিটি এবং যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজিআরসি) গত বৃহস্পতিবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
আগামী ১৫ জুনের মধ্যে এসব নথির সত্যায়িত অনুলিপি ও তথ্য দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে।
এর আগে দুদকে আসা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিএটিবিসির বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতি ও মানি লন্ড্রারিংয়ের’ বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একজন সহকারী পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয় অনুসন্ধান কর্মকর্তার।
শনিবার দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগটি নিয়ে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে। বেশ কিছু নথিপত্রও তলব করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি তিনি।
সম্প্রতি দায়িত্ব পাওয়ার পর অনুসন্ধানের কাজ শুরুর অংশ হিসেবে সহকারী পরিচালক সাজিদ-উর-রোমান এ বিষয়ক নথি তলব করেছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের দুই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৪০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি বিএটিবিসির মোট শেয়ারের মধ্যে ৭১ দশমিক ৯১ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালকদের এবং শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের। বাকিটা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের।
পাকিস্তান আমলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি কারখানা খুলে ব্যবসা চালু করা বহুজাতিক কোম্পানিটির বিরুদ্ধে সম্প্রতি নথি ও কাগজপত্র ‘জালিয়াতির’ মাধ্যমে এর মালিকানা বিএটির (ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো) হাতে রেখে দেওয়ার অভিযোগ দুদকে জমা পড়ে।
তবে কে বা কারা এ অভিযোগ করেছেন তা বলেননি দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি এ অভিযোগ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। এর অংশ হিসেবে যাচাইবাছাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়, পাকিস্তান আমেরিকান টোবাকো (পিএটি) নামে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কারখানায় সিগারেট উৎপাদন করা কোম্পানিটি স্বাধীনতার পর ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে পুরোপুরি বাংলাদেশের মালিকানায় থাকার’ কথা থাকলেও তা হয়নি।
‘জাল কাগজপত্র তৈরি ও প্রভাব খাটিয়ে কোম্পানিটিকে’ বাংলাদেশে নিবন্ধিত দেখিয়ে বিএটিবিসি গত ৫৫ বছরে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে বিদেশে নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে বিভিন্ন তথ্য ও যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়, অথচ কারখানাগুলো আইনত বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন হওয়ার কথা ছিল।
যে অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে তাতে বলা হয়, পিএটি ১৯৪৭ সালে করাচিতে প্রথম কারখানা স্থাপন করে। পরে ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকায় কারখানা স্থাপন করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওই দুই কারখানা পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় যাওয়ার কথা ছিল। পিএটির ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে তাদের দুটি কারখানা হারানোর কথা তুলে ধরেছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়, ওই তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কর ছাড় ও ক্ষতিপূরণও নেয় কোম্পানিটি। এরপর জাল কাগজপত্র তৈরি ও প্রভাব খাটিয়ে কোম্পানিটিকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই কারখানাসহ কোম্পানিটির মালিকানা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর হাতে বহাল থাকে।
দুদকে করা অভিযোগে বলা হয়, সাবেক পিএটির তৎকালীন ফাইন্যান্স ম্যানেজার কয়েকজন মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে জাল কাগজপত্র তৈরি ও দাখিলে ভূমিকা রাখেন। তখন আরজেএসসি এসব নথি গ্রহণে আপত্তি তুললেও সেসব প্রভাবশালীদের চাপে শেষ পর্যন্ত নথি নিতে বাধ্য হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, পাকিস্তানে নিবন্ধিত কোম্পানির স্থলে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি বা বিএটিসিকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত দেখানো হয়। এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই কারখানাসহ কোম্পানির মালিকানা বিএটির অধীনে বহাল থাকে।
এ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে এবং কর ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ আড়াল করতে বিএটি গত তিন দশকে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বা সচিবদের বোর্ডে নিয়োগ বা মনোনয়ন দিয়েছে। পাশাপাশি রাজনীতিকদের লাভজনক এজেন্সি ব্যবসার মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে দুদককে ঢাকার যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের নথির পাশাপাশি পাকিস্তানের করাচিতে পিটিসির ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে। এ জন্য ইসলামাবাদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও করাচিতে কনস্যুলেটের মাধ্যমে নথি সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে এটিকে ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং’ বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বাংলাদেশ টোবাকো কোম্পানি লিমিটেড, পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানি লিমিটেড ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ কোম্পানির নিবন্ধন সম্পর্কিত সব রেকর্ডপত্র চেয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে অনুমোদিত মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন, আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন, কোম্পানির মালিকানা, নিবন্ধিত অফিস, কারখানার তালিকা, সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশনের নম্বর ও তারিখ, অনুমোদিত মূলধন, পরিশোধিত মূলধন এবং শেয়ারের সংখ্যা।
এছাড়া কোম্পানির পরিচালক, পরিচালকদের সম্মতিপত্র এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি চাওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান ও অভিযোগের বিষয়ে বিএটিবিসি এর বক্তব্য জানতে চাইলে কোম্পানির তরফে প্রথমে বলা হয় তাদের গণমাধ্যম দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযো করবে। তবে পরে কেউ যোগাযোগ করেনি।
পরে এ বিষয়ে বিএটিবিসি বিবৃতি দেওয়ার কথা বললেও তা দেয়নি।

