শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির সাথে মানসিক বিকাশে যা করণীয়

familyplayingoutside

শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির সাথে মানসিক বিকাশে কি করণীয়, সে বিষয়ে পরিবারের জানা প্রয়োজন। রাজধানীর আদাবর এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাব কর্মকর্তা পদে কর্মরত আতিকুর রহমান আতিক। তাদের দু’টি কন্যা সন্তান। বড়টি তমা (৫), আর ছোটটি প্রিয়া (৩)। তিনি আর তার স্ত্রী লিনা তাদের সন্তানদের সময় দেন বন্ধুর মত। মেয়েদেরকে পড়ালেখায়, খেলাখুলায়, বিনোদনে, স্বাস্থ্যসেবায়, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য তালিকা তৈরিতে, ধর্মীয় ও বিজ্ঞান শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। মা-বাবা বলেন, শিশুদের সার্বিক বিকাশে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ভূমিকা রাখতে হবে। পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক এবং সকল ইকিবাচক পরিবেশের সাথে পরিচিত করেই শিশুদেরকে লালন-পালন করতে হবে। তাহলেই প্রতিটি শিশু ভবিষ্যতে সুশিক্ষিত, চরিত্রবান, সমাজ, জাতি আর দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ওমর শরীফ ইবনে হাসান বলেন, শিশু জন্মের পর থেকে ৫ বছর বয়সের মধ্যেই সবকিছু শিখে। তখন তাকে যেভাবে শেখানো হবে, ঠিক সেভাবেই সে গড়ে উঠবে। শিশুর কাছে ঘরই হলো প্রথম স্কুল এবং বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরাই তার প্রথম শিক্ষক। কাজেই সার্বিক দিক খেয়াল রেখেই শিশুকে ইতিবাচক শিক্ষা দিতে হবে। শিশুর বিকাশ ও বেড়ে উঠার বিষয়ে তিনি আরো বলেন, যৌথ পরিবারের শিশুরা সার্বিক বিকাশে বেশি সুবিধা ভোগ করে থাকে, যৌথ পরিবারের সকল সদস্যের কাছ থেকে শিশুরা বেশি বেশি শিখতে পারে এরকম অবস্থাতে নেতিবাচক কিছুর সাথে পরিচিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। সময় মতো পুষ্টিকর খাবার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আচার-ব্যবহার, লেখাপড়া, শিক্ষামূলক কথা বলা, জ্ঞান-বুদ্ধি, ভাব বিনিময় আদর্শবান ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশু ছোট বেলায় যা দেখবে তা-ই শিখবে। মা-বাবার মধ্যে যদি আচরণগত সমস্যা দেখা দেয় তবে তা শিশুদের মানসিক বিকাশে এর প্রভাব ফেলে। শিশুর বিকাশে পরিবারের ভূমিকা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউরোলজী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম বলেন, শিশুর বিকাশে আশপাশের পরিবেশেরও একটা ভূমিকা থাকে। প্রতিটি শিশু জন্মলগ্ন থেকেই বেশ কিছু বুদ্ধির অধিকারী, বুদ্ধির সেই ইন্দ্রিয় ¯œায়ুগুলোকে ইতিবাচক কার্যকরী করে তোলাটাই শিশুর বিকাশ। তার বিভিন্ন অনুভূতিগুলোকে ইতিবাচকভাবে কার্যকর করার জন্য পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই জন্মের পর থেকে ৫ বছরের মধ্যেই শিশুকে মানবসম্পদে তৈরি করার জন্য সব ধরনের কার্যকর ভূমিকা ব্যবস্থা হবে। শিশুর সুস্থ বিকাশের ওপরই নির্ভর করবে তার উজ্জল ভবিষ্যৎ। শিশুদের শৈশব হচ্ছে অবারিত আনন্দে বেড়ে ওঠার সময়। এ সময় তারা বড় হয় বাবা-মায়ের সান্নিধ্যে। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে বাবা-মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বাবা-মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ সম্ভব নয়। জন্ম নেয়ার পর থেকেই শিশুরা দ্রুত শিখতে শুরু করে। যখন একটি শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি, স্বাস্থ্য পরিচর্যার পাশাপাশি আদর আর শেখার উদ্দীপনা পায়, তখন সে দ্রুত শেখায় আগ্রহী হয়ে উঠে। শিশু মায়ের স্পর্শ পেলে এবং চাওয়া মাত্রই বুকের দুধ দিলে তার ভেতরে নিরাপত্তাবোধ জন্মে। শিশুদের সঙ্গে কথা বললে, তাদেরকে স্পর্শ করলে, আদর করে জড়িয়ে ধরলে তাদের আবেগ অনুভূতিসহ মানসিক বিকাশ দ্রুত ঘটে। শিখতে, খেলতে ও তার চারপাশ চিনে নিতে উৎসাহ দিলে দ্রুত শেখে এবং তার মানসিক সামাজিক অনুভূতিগত এবং শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটে। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে শিশুর ভাষা, চিন্তা পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বিকশিত হয়। মা-বাবাকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যে, জন্মের পর থেকেই যেন শিশু শিখতে শুরু করে। সে নতুন নতুন জিনিস দেখতে, ধরতে এবং তা নিয়ে খেলা করতে চায়। সে নতুন নতুন শব্দ শুনতে চায়। খেলাখুলায় শিশুরা কল্পনা করতে শেখে, সৃজনশীলতা চর্চা করে। শব্দ, অক্ষর ও সংখ্যা মুখস্থ করার চেয়ে খেলাধুলার মাধ্যমে শেখা শিশুদের জন্য অনেক বেশি উপযোগী। তাই শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য তাকে নানা রঙের জিনিস দেখানো, ধরতে দেয়া, বিভিন্ন শব্দ করে মনোযোগী করে তোলা তার সঙ্গে খেলা করা প্রত্যেক মা-বাবাসহ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উচিত। শিশু যেন পঞ্চইন্দ্রিয় ব্যবহার করার সুযোগ পায়, মা-বাবাকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। বয়স অনুযায়ী শিশুর বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়ামূলক সেবা-যতœ দেয়া পরিবারের কর্তব্য। জন্ম থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো বা অন্যান্য পরিচর্যার সময় তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, গুনগুন করে গান, ছড়া কবিতা শোনানো দরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন শব্দ করা, আঙ্গুলের তুড়ি দিয়ে শিশুকে উদ্দীপ্ত করা, বুকে জড়িয়ে আদর করা, শিশুর শরীর প্রতিদিন ম্যাসেজ করা, শিশুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা এবং আনন্দসূচক শব্দ করে কথা বলা শিশুর বিকাশের জন্য সহায়ক। ৬ মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত শিশুকে পরিচিত জিনিসগুলোর নাম বলা এবং তা দেখতে বলা, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের নামগুলো বলা এবং বলতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এছাড়াও হাত-পা ব্যবহার করে শিশুকে খেলতে দেয়া, তার সঙ্গে খেলা করা, ছোট ছোট প্রশ্ন করা, প্রয়োজনে জবাব দেয়া উচিত। কোন কিছু দেখে ভয় পেলে তার ভয় ভাঙ্গিয়ে দেয়া, দাঁত মাজা, হাত ধোয়া, পোশাক পরা ইত্যাদি বিষয়কে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে সাহায্য করতে হবে। ৯-১০ মাস বয়স থেকে দাঁড়াতে ও হাঁটতে সাহায্য করা মা-বাবাসহ পরিবারের সবার দায়িত্ব। দেড় বছর থেকে তিন বছর পর্যন্ত অন্য শিশুর সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে খেলার সুযোগ করে দেয়া, ছবির বই নাড়াচাড়া করতে দেয়া এবং আঁকাআঁকি করতে উৎসাহ দেয়া উচিত। তাই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে মা-বাবাসহ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অবদান বা ভূমিকা রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। শিশুর সুস্থতা এবং পূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : আফসানা ইয়েসমিন অর্থী

শিশু মনোবিদ


*

*

Top