রিপোর্টারের চোখে সেন্টমার্টিন

farok

ক’দিন আগে ঘুরতে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন । আমরা নিয়মিত দেশী,বিদেশী হাজার পর্যটক ভিড় করি এই দ্বীপে। উপভোগ করি দ্বীপের সৌন্দর্য। এই দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগের বাইরে আমরা কি কখনো খোজঁ নিয়েছি এই দ্বীপের মানুষ গুলোর? কেমন তাদের জীবন,কেমন তাদের জীবন ব্যবস্থা? একজন রিপোর্টার হিসেবে আমার চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি তাদের জীবন ব্যবস্থা। রিপোর্টারের চোখ নিয়ে ঘুরতে গিয়ে কথা বলি এলাকার জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারন মানুষদের সাথে। তাদের কথা শুনে তাজ্জব বনে যাওয়ার মতো অবস্থা। সাত হাজার জনসংখ্যার এই দ্বীপটিতে দশ হাজার জনসংখ্যার বসবাস। তাহলে বাকি তিন হাজার জনসংখ্যা আসলো কোথায় থেকে? জানা যায় অতিরিক্ত তিনহাজার বার্মার থেকে আসা নাগরিক। এখানে দিব্বি বসবাস করছে। বাদ দেই তাদের কথা।

যারা এখানকার নাগরিক তাদের খুব করুণ অবস্থা। এখানে প্রত্যেকটি পরিবার আট নয়জন করে বাচ্চা নেয়। দ্বীপের মানুষ গুলো জীবিকা নির্বাহ করে মাছ ধরে আর মাছ বিক্রি করে। তাদের পরিবার সন্তানরা বলি হয় শিশুশ্রমের। তাদেরকেও নেয়া হয় মাছ ধরার কাজে। নেই কোন পরিবার পরিকল্পনা। শুধু তাই নয়,বাল্য বিবাহ হয় নিয়মিত।

অথচ সেন্টমার্টিন দ্বীপসহ পুরো টেকনাফে সাত আটটি এনজিও কাজ করে এসব নিয়ে কিন্তু সেন্টমার্টিন দ্বীপটি দেখলে কখনোই বোঝার উপায় নেই যে,এনজিওরা তাদের নিয়ে কি কাজ করে। এসব নিয়ে ঢাকায় ফিরে ফোনে কথা বলি টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী হোসেনের সাথে,তিনি উল্টো ক্ষোভ নিয়ে বলেন,বিভিন্ন্ জায়গায় শুধু এনজিও গুলোর নামী,দামী ব্র্যান্ডের গাড়ি দেখি অথচ তাদের কোন কাজ আমার চোখে পড়ে না। তারা আমাদের সরকারী কর্মকর্তা কারো সাথে যোগাযোগও করে না। তারা কি করে আল্লাহই জানে!

এখানে শিক্ষা,স্বাস্থ্য বিনোদনের মতো মৌলিক অধিকার গুলো শহরের পুস্তকেই দেখা যায়। আমরা যে হোটেলে ওঠেছি,সেই হোটেলের মালিক এবং দ্বীপের জিনিজিরার সাবেক মেম্বার মোজাম্মেল হক জানায়, তাদের দ্বীপের মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য গুলো টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে নিতে বিজিবি কর্তৃক বিভিন্নভাবে হয়রানি হতে হয়। শুধু তাই নয় এক রাস্তা সিমেন্ট আনলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু অনেকের অনুমতি লাগে।

দ্বীপের বিভিন্ন হাসিল বা ইজারার নাম দিয়ে ঘাটে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সংকট, স্থানীয়দের আবাসন তৈরিতে প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা সমস্যা ছাড়াও প্রবাল দ্বীপে সরকারি হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় দুর্ভোগের চিত্র ধরা পরে সহসায়।

দ্বীপের লালিন হোসেন জানান টেকনাফ থেকে চাল, তৈল, ডাল, তরকারি, আবাসনের জন্য ইট, সিমেন্ট, বালি ইত্যাদি নিতে টেকনাফ ঘাটে হাসিল বা ইজারার নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। আর ঐ টাকা না দিলে কোনো মালামাল ট্রলারে বহন করে দ্বীপে নেয়া যায় না। এরপর হাসিলের টাকা আদায় করেও রেহাই নেই দ্বীপবাসীর।

আরো জানতে পারি,প্রশাসন কর্তৃক অনুমতির কাগজপত্র রয়েছে কিনা তা দেখতে বিজিবি কর্তৃক মালামাল তল্লাশির নামে হয়রানি ও ভোগান্তি সহ্য করতে হয় তাদের। এসব কিছুর পর ট্রলার যোগে সেন্টমার্টিনে পৌঁছলে আবার দ্বিতীয় দফা ইজারা দিয়ে হয়। যেমন টেকনাফের ঘাটে একটি চালের বস্তা প্রতি ১৫ টাকা করে এবং সেন্টমার্টিন ঘাটেও ১৫ টাকা করে দিতে হয়। ফলে সব কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায় দ্বিগুণ। এতে দ্বীপবাসী প্রশ্ন তুলেন, আমরা কি ভিন্ন কোনো দেশে বসবাস করছি। কেন একটি খাদ্য পণ্যে দুইবার ইজারা নেয়া হয়। কেন বিজিবি কর্তৃক তল্লাশির নামে হয়রানি করা হয়। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের কোনো ঘাটও নেই। ফলে ওই দেশে পাচারে কোনো প্রশ্নই আসতে পারে না।

তাছাড়া বঙ্গোপসাগের সর্বদা নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ড নিয়োজিত রয়েছে। দ্বীপবাসীরা প্রশ্ন রাখেন, কেন এই হয়রানি ও অবিচার? আমরা কি স্বাধীন দেশের ভূ-খন্ডের জনগণ নই?

৭ হাজার জনগণের জন্য দ্বীপে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ৫০০ শিক্ষার্থীর জন্য আছে মাত্র দুইজন সরকারী শিক্ষক। ফলে বিপর্যস্ত ও পিছিয়ে পড়েছে দ্বীপের শিক্ষা ব্যবস্থা। তবুও শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত তিন বছরে শতভাগ পাস করেছে দ্বীপের প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা। ওই স্কুলে ক’দিন পর পরই অভিযোগ মিলে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানীর মতো ঘটনার। এর কোন প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো শিক্ষকরা অভিবাকদের মামলা ঢুকে দেয়ার হুমকি দেয়। দ্বীপটার শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই খারাপ।মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য একটি হাই স্কুল থাকলেও নেই কোন কলেজ। বিশেষ করে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষা নিতেই পারে না । বলা চলে মেয়েদের ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষার হার একেবারই শূন্যের কোঠায়। অথচ বাংলাদেশ সরকার দিনের পর দিন নারী শিক্ষার প্রতি খুব জোর দিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপের নারী শিক্ষা নিয়ে গত ১৪ নভেম্বর ইত্তেফাকে একটি সচিত্র প্রতিবেদন করেছিলাম।

এখানে চিকিৎসা সেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে দ্বীপবাসী। একটিমাত্র হাসপাতাল থাকলেও নেই কোনো চিকিৎসক। বিশেষ করে প্রসূতি নারীরা নানান সময় বেশ ঝুঁকিতে থাকতে হয়। এমনকি নিয়মিত প্রসূতি নারীদেও মৃত্যুও হয়।

দ্বীপবাসীরা প্রশ্ন তুলেন, সরকারি চিকিৎসক দ্বীপে পাঠালেও কেন অবস্থান করে না। দ্বীপবাসীরা অভিযোগ কওে, আবাসন তৈরি করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা আসে। পরিবেশের কথা বলে কোনো ঘর-বাড়ি নির্মাণ করতে দেয়া হয় না। অথচ, দ্বীপে দ্বি-তল ও তৃতীয় তলা বিশিষ্ট হোটেল-মোটেল তৈরি করা হয়েছে। তখন পরিবেশবাদীরা কোথায় থাকেন। এতে দ্বীপবাসীর সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে না?

মোহাম্মদ ওমর ফারুক

ফিচার রির্পোটার, দৈনিক ইত্তেফাক


*

*

Top