যশোরের ২ মাছ চাষীর অভাবনীয় সাফল্য

Bangladesh-can-boost-fish-output1

নিজেদের কোন আবাদি জমি ছিল না। এক মাত্র বাবার আয় দিয়েই চলতো আট সদস্যের সংসার। অভাব যেন নিত্যসঙ্গী এ পরিবারের। এই অভাবের সাথে যুদ্ধ করে দ’ুবেলা দু’ মুঠো ভাতের যোগাড় করতে বাবা হিমশিম খেতেন। তাই লেখাপড়া বাদ দিয়ে তাকেও রোজগারে নামতে হয়। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। আর পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই- এ কথাটি বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গেই বললেন, যশোর সদরের চাঁচড়া গ্রামের সফল মৎস্য চাষি নুরুল ইসলাম বাবু। নিষ্ঠা, সততা ও পরিশ্রমের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে তিনি তেলাপিয়া চাষ করে জিরো থেকে হিরো হয়েছেন। অর্জন করেছেন অভাবনীয় সাফল্য। তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনে সফলতা স্বীকৃতি স্বরুপ তার শাহ আলী মৎস্য খামার পেয়েছে সনদ। এ বছর তার নিট আয় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা।
আর উন্নত জাতের কৈ আর শিং মাছের চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন যশোরের মৎস্য চাষি মফিজুর রহমান তরফদার। চাঁচড়া বর্মণপাড়ায় ৬ হেক্টর জমিতে ১০টি পুকুরে প্রতি বছর গড়ে ২শ’মেট্রিক টন মাছ উৎাদন করছেন। যার বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। আর উৎপাদন খরচসহ যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ শেষে প্রতি বছর প্রায় ৬৫ লাখ টাকার মুনাফা করছেন তিনি। ব্যবসায়িকভাবে এখন চাঁচড়ার বড় মাছ চাষিদের মধ্যে তিনি এখন অন্যতম।
মাছ চাষে সাফল্যের জন্য স্বীকৃতিস্বরুপ ইতিমধ্যে তিনি কয়েকবার জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ মাছ চাষি হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। ১৯৯০ সালে মফিজুর রহমান লেখাপড়া ছেড়ে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মফিজুর রহমান মাছ চাষে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। আর এ ব্যবসার মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখেন। বর্তমানে তিনি বর্মণপাড়ায় নিজস্ব ৬ হেক্টর জমিতে ছোট বড় ১০টি পুকুর খনন করে সেখানে উন্নত জাতের কৈ ও শিং মাছের চাষ করছেন। গত বছর তিনি আড়াই শ’ মেট্রিক টন কৈ ও শিং মাছ উৎপাদন করেছেন ।


নুরুল ইসলাম বাবু জানান, তারা ছয় ভাই বোন। বাবা আলী হোসেনের আয়ে চলতো সংসার। নিজস্ব কোন জমি না থাকায় অন্যের পুকুর লিজ নিয়ে বাবা মাছ চাষ করতেন। আমি সবার বড় ছেলে । অভাবের কারণে অষ্টম শ্রেণীর পর আর লেখা পড়া হয়নি। লেখা পড়া ছেড়ে বাবার সাথে মৎস্য খামারে কাজ শুরু করি। মাছ চাষে সফলতাও আসে। সংসারের অভাব কিছুটা লাঘব হল। এর পর ২০০০ সালে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য একক ভাবে শুরু করেন মাছের চাষ। বাবা আলী হোসেন, প্রতিবেশি ভাই ভাই মৎস্য খামারের হারুন-আর-রশিদ ও জমজম মৎস্য খামারের ফিরোজ করির বকুলের অনুপ্রেরণায় ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এক বিঘার একটি পুকুর লিজ নেন বাকিতে। আর বাকিতে ছাড়া হয় তেলাপিয়া মাছের পোণা। এ বছরই লাভ হয় প্রায় ১ লক্ষা টাকা। শুরু হয় তার সফলতার পথচলা। এর পর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
তিনি আরো জানান, বর্তমানে তিনি ৯টি পুকুররে তোলাপিয়া মাছ চাষ করেছেন। পুকুরজলা মিলে ১৩ হেক্টরজমিতে তার মাছ চাষ চলছে। তার খামারে মাছের খাবার দেয়া, জাল দিয়ে মাছ ধরা ও পরিচর্যায় নিয়মিত ৭ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা কাজ করেন। আর অনিয়মিতি শ্রমিক আছে প্রায় ১১জন। ফলে বাবুর শাহ আলী মৎস্য খামারে ২০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ বছর প্রতি হেক্টর জলাশয়ে ৫৮.১৮ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। এ খাতে তার বিনিযোগ মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
এ বছর তার মোট বেচাকেনা হয়েছে ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকাও বেশি। এতে তার তার নিট আয় হয়েছে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
যশোর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, যশোর জেলায় প্রতিবছর দুই লাখ পাঁচ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। তিনি বলেন গত কয়েক বছরে মাছ চাষীর সংখ্যা বেড়েছে অনেক। তাদের অনেকের সাফল্য আকাশ ছোঁয়া। চাহিদার কারণে এ অঞ্চলে কৈ ও শিং তেলাপিয়া,পাঙ্গাস জাতীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ চাষীরাও লাভ করছেন অনেক।


*

*

Top