‘মেয়ে মানুষ ট্রেন চালাতে এসেছেন কেনো?’

salma

টিবিটি: ‘বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর। অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের এ কবিতা যেন ঠিক তার জীবনকে নিয়েই লেখা। বেগম রোকেয়া যে অন্ধকার দেয়াল ভেদ করে নারী মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন; তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এ নারী। তিনি দেশের প্রথম নারী ট্রেন চালক সালমা খাতুন।

সাহসে, প্রজ্ঞায় তিনি বাংলাদেশের নারীদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। সেই নারীদের জন্য ব্যতিক্রম কিছু করার ইচ্ছা থেকেই এ পেশায় আসা তার। শত প্রতিকূলতা, সমাজ- সংসার, আশপাশের মানুষের বহু বাঁধা- কোনো কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। এমনকি নিয়োগ পরীক্ষার ভাইভাতেও নিরুৎসাহিত করে বলা হয়েছিলো, ‘এ কাজ মেয়েদের জন্য নয়। তুমি পারবে না।’

তবে সেদিন সালমা খাতুন দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি পারবো। অবশ্যই পারবো।’ শেষ পর্যন্ত সালমা খাতুন পেরেছেন। পেশাগত জীবনে এসে নিজের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং সমাজে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন অনেক পুরস্কার।

চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ নারী শুনিয়েছেন দীর্ঘ সংগ্রামের পর ট্রেন চালনার মতো একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় টিকে থাকার গল্প। জানিয়েছেন, নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এ অবস্থানে পৌঁছানোর কথা।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের মেয়ে সালমা খাতুন। কৃষক বাবার ৫ সন্তানের মধ্যে তিনি চতুর্থ। বাবা বেলায়েত হোসেন খান ও মা সাহেরা বেগমের এই কন্যাটি ছোট থেকেই চিন্তা-ভাবনায় অন্য ভাইবোনদের থেকে একেবারেই ব্যতিক্রম। ছোট থেকে চাইতেন চ্যালেঞ্জিং ও ব্যতিক্রমধর্মী কোনো পেশায় যেতে। তার এ কাজে উৎসাহ যুগিয়েছেন বড় ভাই আবুল হোসেন আজাদ।

salma-4-1

২০০০ সালে অর্জুনা মুহসীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০০২ সালে কুমুদিনী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এইচএসসি পাশের পরই বড় ভাইয়ের কাছে রেলওয়েতে ট্রেন চালক পদে নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে জানতে পারেন। কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই সালমা বেগম সেখানে আবেদন করেন। বুঝতে পারেন তার ব্যতিক্রমধর্মী কিছু করার আকাঙ্ক্ষা চূড়ান্ত রূপ পাবে এর মাধ্যমে। সেবছর সারাদেশ থেকে প্রায় ২০ হাজার চাকরিপ্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেন। চূড়ান্ত পরীক্ষায় সফল হয়ে তাদের মধ্যে একমাত্র নারী ট্রেন চালক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

তবে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সফল হতে হয় তাকে। এমনকি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পর তাকে শুনতে হয়, ‘ট্রেন চালানো অনেক কঠিন কাজ। পুরুষরাই এ কাজ পারে না। সেখানে নারী হয়ে তুমি পারবা?’

তবে সেদিন সালমা খাতুন দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি পারবো, অবশ্যই পারবো।’’ সালমার এমন দৃঢ়তায় সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলো ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা।

এর প্রায় চার মাস পর সালমার বাড়িতে আসে চাকরি পাওয়ার চিঠি। ২০০৪ সালের ৮ মার্চ যোগ দেন তিনি যোগদান করেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে। ওই বছর সারাদেশ থেকে ট্রেন চালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ৬৫ জনের মধ্যে একমাত্র নারী চালক ছিলেন সালমা।

তিনি প্রথমে যোগ দেন সহকারি লোকো মাস্টার হিসেবে। এই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন লেকো মাস্টার। চাকরি জীবনে ঢুকেও থেমে থাকেনি সালমা খাতুনের শিক্ষা কার্যক্রম। একই সাথে চালিয়ে গেছেন পড়াশুনাও। ২০১১ সালে বিএসএস, ২০১৩ সালে বিএড এবং মাস্টার্স করেন ২০১৫ সালে।

বর্তমানে ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে ট্রেন চালান এ নারী। এই কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত তাকে মুখোমুখি হতে হয় নানা অভিজ্ঞতার।এরমধ্যে যেমন আছে কষ্টের অভিজ্ঞতা, তেমনি রয়েছে মজার মজার নানা অভিজ্ঞতা।

সেসব উল্লেখ করে সালমা খাতুন বলেন, ‘স্টেশন থেকে সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত আমরা ট্রেন ছাড়তে পারিনা। নির্ধারিত সময়ের আগেই ইউনিফর্ম পরে চালকের আসনে গিয়ে বসি। ট্রেন ছাড়তে দেরি হলে মাঝে মাঝে কিছু মানুষ এসে বলে, “আপা ট্রেন নিয়ে যাচ্ছেন না কেনো? মনে হয় পারেনা না। মেয়ে মানুষ ঘরে বসে থাকবেন? ট্রেন চালাতে এসেছেন কেনো?’’

প্রতিনিয়ত এমন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় সালমাকে। তবে এসবের ব্যতিক্রমও ঘটে। একজন নারী ট্রেন চালাচ্ছেন শুনে দেখা করতে আসে অনেকেই। তার সাথে ছবি তুলতে অনুরোধ করেন। বিশেষ করে মেয়েরা অনেক খুশি হয়।

তাদের কেউ কেউ বলেন, ‘‘আপু উই আর প্রাউড অফ ইউ।” তাদের এ সমর্থন সালমাকে আরো সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেয়। তবে প্রায়ই একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। যে ঘটনা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। তাহলো; ট্রেন চালানোর সময় প্রায়ই দেখতে পান লাইনের উপর দিয়ে মানুষ হাঁটছে, দৌড়চ্ছে। শত হুইসেল দিলেও তাদের কেউ কেউ সরে দাঁড়ান না। আবার অনেক সময় গেটম্যান সিগন্যালবার ফেলার পরও দেখা যায় লাইনের ওপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে অনেকেই। যে কারণে ঘটে নানা দুর্ঘটনা। বিষয়গুলো ভীষণ কষ্টদায়ক।

এমনই একটি দিনের কথা উল্লেখ করে সালমা বলেন, ‘সেদিন হঠাৎ ট্রেন লাইনের ওপরে দেখি সাদা-লাল ফ্রক পরা ছোট্ট এক শিশু হেঁটে যাচ্ছে। শিশুটিকে দেখার সাথে সাথেই মনে পড়ে যায় আমার নিজের মেয়ের কথা। অনেক হুইসেল দেবার পরও আপন মনে হেঁটে চলেছে শিশুটি। সেসময় আমার ট্রেনের পুরো ব্রেকই প্রয়োগ করি। ধীরে ধীরে ট্রেনটি এগিয়ে যেতে থাকে শিশুটির দিকে। ট্রেনটি যখন প্রায় শিশুটির কাছাকাছি পৌঁছে যায় তখন তার মা এসে তাকে সরিয়ে নেন লাইন থেকে।’ সেদিনের সেই স্মৃতি এখনো আপ্লুত করে সালমা খাতুনকে।

এ পেশায় অনেক বেশি মনোযোগ ও একাগ্রতা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি বলেন, চাকুরিতে যোগদানের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো তাকে সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতে হয়, ‘‘আমরা ছেলেরাই যেখানে ট্রেন চালাতে হিমশিম খাই সেখানে তুমি কেন এসেছো? পদ চেঞ্জ করে চলে যাও।’’

দেশের নারীদের এগিয়ে নেয়ার জন্য এ কাজ করছেন উল্লেখ করে সালমা বলেন, ‘আমি যে কাজ করছি তা, দেশের মেয়েদের এগিয়ে নিতেই। আমাকে দেখে যেনো অন্যরা উৎসাহিত হয় সেজন্যই করা। প্রথম প্রথম যখন এ কাজে আসি তখন অন্যদের মেনে নিতে কষ্ট হত। কিন্তু এখন সবাই এটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে।’

দেশের সব নারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রতিবন্ধকতা আসবেই এবং সেটাকে জয় করাই নারীদের কাজ।”


*

*

Top