বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়: নিরন্তর পথ চলার ৬ বছর

barisalnewscom-thumbnail

টিবিটি শিক্ষা: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ৭ বছরে পদার্পণ করছে। শুভ জন্মদিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে থাকছে ২ দিনব্যাপী বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের  এ বর্ণিল আয়োজনকে আরও আলোকিত করতে উপস্থিত থাকছেন এমন একজন যার হাত দিয়েই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের শুভ সূচনা হয়েছিল, তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি। উপস্থিত থাকছেন দক্ষিন বাংলার রাজনৈতিক অভিভাবক পার্বত্য শান্তিচুক্তির রূপকার বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইফ জনাব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ এমপি, জেবুন্নেসা আফরোজ এমপি, এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস এমপি সহ আরও সুধিজন। নিরন্তর পথচলার এ ৬টি বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নানাবিধ কারণে আলোচনায় এসেছে। দেশের ৩৭ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি নবীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় যা দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ এবং আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক। একঝাঁক তরুণ ও মেধাবী শিক্ষকমন্ডলী, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রমে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় এগিয়ে চলছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

 দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশ পুন:গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। প্রকৃতিগতভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চল নদ-নদীবিধৌত হওয়ায় শিক্ষাদীক্ষা, ব্যবসা বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। উচ্চশিক্ষা অর্জনে এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের ‘প্রা”্যরে অক্সফোর্ড খ্যাত’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরই নির্ভর করতে হত। অর্থনৈতিকভাবে এ অঞ্চল তেমন সমৃদ্ধ না হওয়ায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের সুযোগ অনেকটাই সীমিত গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আর এহেন বাস্তবতায় ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বরিশালের বেল্স পার্কে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় তাঁর ভাষণে ঢাকার বাইরে বরিশালে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের  ঘোষণা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণাকে বাস্তবে পরিণত করার লক্ষ্যে ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণপ্রজতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা বরিশাল নগরীর কর্ণকাঠীতে ৫০ একর জমিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হয়। একই সাথে ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি বরিশাল নগরীর ঐতিহ্যবাহি জিলা স্কুল ক্যাম্পাসের কলেজ ভবনে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি আনুষ্ঠানিক ভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে ববির একাডেমিক কার্যক্রমের শুভ সূচনা করেন।

 প্রতিষ্ঠাকালীন ০৪ টি অনুষদের অধীন ০৬ টি বিভাগে ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। নবীন এ বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশীদ খান। কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় আজ এগিয়ে যাচ্ছে তাঁর আপন গতিতে। আর এর নেতৃত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান উপাচার্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞানী বাংলাদেশ মৃত্তিকা বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি, বিসিএসআইআর এর সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের প্রাক্তন প্রফেসর ড. এস এম ইমামুল হক। তাঁর অভিভাবকসূলভ আচরণ এবং যোগ্য নেতৃত্বে ইতোমধ্যেই নবীন এ বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশ বিদেশের মানুষের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের ভর্তি পরীক্ষায় পূর্বেকার প্রচলিত ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের মধ্য দিয়ে ৩ ইউনিটের (ক,খ ও গ) ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে বর্তমান উপাচার্য মহোদয়ের সময়োচিত পদক্ষেপের কারনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ‘প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত’ বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা নদি তীরে অবস্থিত নয়ণাভিরাম সৌন্দর্যের লীলাভূমি কর্ণকাঠীতে

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় তার আপন নিবাসে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সমান্তরাল গতিতে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মত নিয়োগ দেয়া হয়েছে একজন দক্ষ ও চৌকস ট্রেজারার। এ পদে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মাহবুব হাসান। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষ ও যোগ্যদের পদায়ন করা হয়েছে। যার দরুন গতির সঞ্চার হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ০৬ টি অনুষদের অধীন ২০ টি বিভাগে ৫,০৫৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক রয়েছেন ১৫১ জন, কর্মকর্তা ৫৫ জন, কর্মচারী রয়েছেন ১৬৫ জন। বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ২টি ছাত্র হল এবং ১টি ছাত্রী হল। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বাস, মিনিবাস ও মাইক্রোবাসসহ রয়েছে ১১টি যানবাহন।  নির্মিত হয়েছে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য ডরমেটোরি, চালুর অপেক্ষায় রয়েছে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী ও ক্যাফেটোরিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ভবনগুলোতে লাগানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা, নির্মিত হয়েছে পুলিশ ক্যাম্প। রাতের ক্যাম্পাসকে আরও মোহনীয় করে তুলতে স্থাপন করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব সোলার প্যানেল যুক্ত এলইডি লাইটের ল্যাম্প পোষ্ট।

 তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, অত্যাধুনিক ভিডিও কনফারেন্স রুম, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়াম এবং ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধনে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ বৃক্ষ। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. এস এম ইমামুল হক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ‘ধূমপান মুক্ত পরিবেশবান্ধব  সবুজ ক্যাম্পাস’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। চলতি ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ হতে  চালু হয়েছে ‘কোস্টাল স্টাডিজ এন্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘দর্শন’ বিভাগ । ৬টি বিভাগ থেকে এ বছর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্রাজুয়েট বের হয়েছে। একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও রয়েছে সফলতার ছোঁয়া। ইতোমধ্যে নবীন এ বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ান ও রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে, একই সাথে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রয়েছে এখানকার শিক্ষার্থীদের সফল পদচারণা। শীঘ্রই নির্মিত হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সম্বলিত ম্যুরাল। ছাত্রীদের জন্য বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল নির্মানের কাজ শুরু হচ্ছে অচিরেই। শিক্ষার্থীদের পরিবহনে যুক্ত হচ্ছে ১টি বড় বাস এবং জরুরী এ্যাম্বুলেন্স সেবা।

 শীঘ্রই চালু হচ্ছে ল্যাঙ্গোয়েজ সেন্টার। নির্মিত হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল সেমিনার হল। আগামীতে ‘ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা’ বিভাগ এবং ‘বায়োক্যামেস্ট্রি এন্ড বায়োটেকনোলজি’ নামে ২টি বিভাগ চালু হবে। সীমানা প্রাচীরের কাজ এগিয়ে চলছে দ্রুত গতিতে। নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিনন্দন কেন্দ্রীয় প্রবেশদ¦ার। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চলতি বছরের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আধিক্য পরিলক্ষিত হওয়ায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত শেখ হাসিনা প্রতিটি জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁর সে ঘোষণার কার্যকারিতা প্রতিফলিত হয়েছে। সব মিলিয়ে মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের সময়োপযোগী ও দক্ষ নেতৃত্বে একটি সুন্দর আগামীর পথে এগিয়ে চলছে আমার আপনার প্রাণের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। শুভ হোক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এ নিরন্তর পথচলা।


*

*

Top