ফেসবুক যেভাবে ট্রাম্পকে জিততে সাহায্য করেছে

4d48abd5cfc9eab7952901b210591a35-5ab28f31d4651

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে করা সব জরিপ মিথ্যা প্রমাণ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এমন জয়ে একটি ফেসবুক অ্যাপ ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। অ্যাপটির নাম ‘দিসইজমাইডিজিটাললাইফ’। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক আলেক্সান্ডার কোগান এটি তৈরি করেছিলেন। নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করা ব্রিটিশ সংস্থা ‘কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা’র হয়ে অ্যাপটি ডেভেলপ করেছিলেন কোগান।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা প্রচারণায় সহায়তা পেতে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। সেই সময় ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের পরামর্শক হিসেবে কাজ করা স্টিভ ব্যাননসহ কয়েকজন রিপাবলিকান সমর্থক কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

দিসইজমাইডিজিটাললাইফ অ্যাপটি ২০১৫ সালে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ওপর একটি জরিপ চালায়। ফেসবুকের এই অ্যাপ ছিল মূলত একটি কুইজ। এর মাধ্যমে কুইজে অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিত্বের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা। প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী ওই কুইজে অংশ নেন। অর্থাৎ কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা এই অ্যাপের মাধ্যমে তিন লাখ ২০ হাজার জনের বিস্তারিত তথ্য পেয়েছিল। শুধু তাই নয়, ফেসবুকের সেই সময়কার নীতি অনুযায়ী, অ্যাপটির মাধ্যমে ওই তিন লাখ ২০ হাজার জনের বন্ধুদের বিস্তারিত তথ্যও কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার হাতে চলে যায়। সব মিলিয়ে পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য পায় গবেষণা সংস্থাটি। পরে এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়। যে ভোটারের ব্যক্তিত্ব যেমন তাকে লক্ষ্য করে ঠিক তেমন বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যাপের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবির এতো বেশি সংখ্যক ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য হাতে পেয়েছিল, যা ইতোপূর্বে কেউ পায়নি। অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো কৌশলের কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা’র প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্ডার নিক্সকে মঙ্গলবার বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের জয়ে তাদের বিরাট ভূমিকা ছিল। যুক্তরাজ্যের চ্যানেল ফোর-এর একদল ছদ্মবেশী সাংবাদিকের কাছে তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন।

চ্যানেল ফোরের ভিডিওতে দেখা গেছে, নিক্স তার কোম্পানির কাজ করার বিভিন্ন উপায় বর্ণনা করছেন। রাজনীতিবিদদের ঘুষ দেওয়া, তাদের কাছে সুন্দরী মেয়েদের পাঠিয়ে তাদের বিতর্কিত করে তোলার মতো উপায় ব্যবহার করা হয় বলে মন্তব্য করেন নিক্স। এমন মন্তব্যের জন্য মঙ্গলবার তাকে বরখাস্ত করে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা। তবে ট্রাম্পের প্রচারণায় ফেসবুকের তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলেক্সান্ডার কোগান অবশ্য দাবি করেছেন, তার সংগ্রহ করা তথ্যের নির্ভুলতার বিষয়টি বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। এসব তথ্য নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম বলে তিনি মনে করেন না।

প্রতিক্রিয়া

কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার বিষয়টি সামনে আসায় গত দুই দিনে ফেসবুকের শেয়ারমূল্যের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ফেসবুক নিজেও এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। কেমব্রিজের শিক্ষক অবৈধভাবে কাজটি করেছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। অবশ্য এই ঘটনা জানার পর ফেসবুক অ্যাপের মাধ্যমে বন্ধুদের তথ্য সংগ্রহ করার সুবিধাটি বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে। তবে ফেসবুকের এই প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্ট নন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের এমপিরা। বিষয়টি নিয়ে ফেসবুক কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হতে চান তারা। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও তাজানি এক টুইটে লিখেছেন, ‘৫০০ মিলিয়ন ইউরোপীয় নাগরিকের প্রতিনিধিদের সামনে ফেসবুককে এই ব্যাখ্যা দিতে হবে যে, গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে না।’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে অবশ্য এরইমধ্যে ফেসবুকের বক্তব্য জানতে চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় কমিটি জানিয়েছে, তারাও অভিযোগের জবাব পেতে জাকারবার্গকে কংগ্রেসে ডাকবেন। ঘটনার তদন্তও অব্যাহত থাকবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল ব্যক্তিগত গোপন তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া নয়; ফেসবুক তার গ্রাহকদের ওপর নজরদারিও চালায়। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠার পর থেকে ফেসবুকের সুনাম কলঙ্কিত হতে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় ট্রাম্প শিবির থেকে ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া খবর ছড়ানোর মাধ্যমে ভোটারদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। ওই অভিযোগের রেশ না কাটতেই এবার ফেসবুক কর্তৃক গ্রাহকের তথ্য চুরির অভিযোগ সামনে এলো।

২০ মার্চ ২০১৮ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় কমিটির ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ডিয়ানি ফেইনস্টেইন বলেছেন, গ্রাহকদের তথ্য বিষয়ে ফেসবুকের ধারণা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে কংগ্রেস উপস্থিত হতে হবে। সূত্র: ডয়চে ভেলে, ফার্স্টপোস্ট, ইউএসএ টুডে।


*

*

Top