ঢাবির সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের বিশ্ব সমুদ্র দিবস পালন

IMG_1608 (573 x 430)

টিবিটি জাতীয়ঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব সমুদ্র ও পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রোববার সকাল ৯ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

দিন ব্যাপী আয়োজিত কর্মসূচীর মধ্যে ছিল সেমিনার, র‌্যালী ও বিভিন্ন শিল্পকর্ম প্রদর্শন।

সামুদ্রিক পরিবেশের সুরক্ষায় জাতিসংঘ ঘোষিত দিবসটি ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছরের ৮ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর সব প্রাণের সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নির্ভর করে সামুদ্রিক পরিবেশে সুরক্ষিত থাকার ওপর- বিষয়টি মাথায় রেখে এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সুস্থ সাগর, সুস্থ পৃথিবী’।

সমুদ্র বলতে যারা একটু ভ্রমণমুখী, তাদের চোখে ভেসে উঠবে কক্সবাজার, পতেঙ্গা, কুয়াকাটা কিংবা টেকনাফের সমুদ্র সৈকতগুলির ছবি। এখন অবশ্য সমুদ্রের উপরিভাগ আর তলদেশ আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। টিভির পর্দায় চোখ রাখলেই দেখা যাবে নানা চ্যানেলের আয়োজন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি কিংবা এনিমেল প্লানেট। এসব চ্যানেলে সমুদ্রকে ঘিরে দুর্দান্ত সব অভিযান আর বিচিত্র সব প্রাণীদের নিয়ে অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয় নিয়মিত।

কিন্তু আমরা খালি চোখে যেটুকু দেখি, সমুদ্রের অবদান আর আবেদন তার চেয়েও অনেক বেশি। সাগর- মহাসাগরকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। আমাদের অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা হলো এসব সাগর আর মহাসাগর।

সমুদ্রের এই সব অবদান, আবেদন, প্রয়োজনীয়তা আর উপকারীতাকে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বের সবার সামনে তুলে ধরতে প্রতি বছর ৮ জুন পালন করা হয় বিশ্ব সমুদ্র দিবস।

বিশেষ এই দিবসটি পালনের প্রস্তাব প্রথমবার নিয়ে আসে কানাডা। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় অনুষ্ঠিত হয় ধরিত্রী সন্মেলন। সেই সন্মেলনেই কানাডা সমুদ্র নিয়ে একটি বিশেষ দিবস পালনের প্রস্তাব দেয়। সমুদ্রের বিশ্বব্যাপী ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তারপর থেকে নানা রকম চিন্তা-ভাবনা চলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্ব সমুদ্র দিবস পালনের প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। অধিবেশনে জাতিসংঘ এই বিশেষ দিবসটি পালন করার জন্য সব সদস্য রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর ৮ জুন আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হয়ে আসছে বিশ্ব সমুদ্র দিবস।

দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো, সাগর-মহাসাগর সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা। সেই সঙ্গে সমুদ্র ব্যবহার ও পরিবেশ ভাল রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইনের বিন্যাস, বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের দরজা খুলে দেয় এই বিশেষ দিবসটি। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত জলরাশি হিসেবে সমুদ্রকে সন্মান জানানোর পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয় বিশ্ব সমুদ্র দিবস।

সমুদ্র আমাদের নানা ভাবে উপকার করে চলে। এই সাগর-মহাসাগরগুলো পৃথিবীর শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া আমাদের বেশিরভাগ খাদ্য ও অষুধের উৎসও হলো সাগর ও মহাসাগরগুলো।

087A3419 (646 x 430)

অসংখ্য কারণে মানুষ সমুদ্রের উপর নির্ভর করে। তিনি বিলিয়নের বেশি মানুষ সরাসরি সামুদ্রিক জীববৈচিত্রের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। সমুদ্র থেকে মানুষ প্রতি বছর যে পরিমাণ সম্পদ আহরণ করে এবং এর উপর ভিত্তি করে পণ্য উৎপাদন করে তার অর্থনৈতিক মূল্য বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

এতো উপকার করার পরেও আমরা সমুদ্রকে রেহাই দিচ্ছি না। দিনের পর দিন নানা ভাবে, নানা চেহারা তার ক্ষতি করেই চলছি। পরিসংখ্যান আর বাস্তবতা বলছে, মোট সাগর আর মহাসাগরের ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষতির শিকার হয়ে গেছে। মানবসৃষ্ট দূষণ আর আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে চলছে এই মহান জলরাশিগুলি।
বিজ্ঞানীরা জানান, বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ প্লাস্টিকজাত আবর্জনায় ভরে গেছে এই সব সমুদ্রের কোল।

জাতিসংঘের পরিবেশ সমীক্ষার এক তথ্যমতে, সমুদ্রের প্রতি বর্গমাইলে ৫০ হাজার পর্যন্ত প্লাস্টিকের বোতল ভাসতে দেখা যায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তেল, কেমিক্যালসহ আরো নানা রকম বর্জ্যরে নমুনা। অনেকে ক্ষোভের সঙ্গে বলে বসেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে সমুদ্র।

সারা বিশ্বে আজ সমুদ্র ও উপকূলবর্তী উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। সাগর ও মহাসাগর নিয়ে জাতসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কার্যালয় একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে যার নাম ‘গ্রিন ইকোনমি ইন এ ব্লু ওয়ার্ল্ড’- এই প্রতিবেদনে বিশ্বের সমুদ্রগুলির এক করুণ অবস্থা ফুটে উঠেছে। জলাবায়ু পরিবির্তন, নানা রকম দূষণ ও সামুদ্রিক সম্পদের মাত্রাহীন ব্যবহারের ফলে আজ এই রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষকে। এর পরিস্থিতির ধারাবাহিকতার ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্থ হতে হচ্ছে।

তবে সাগর ও মহাসাগরগুলিকে বাঁচানোর এখনও সুয়োগ আরে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনগুলির সন্মিলিত সক্রিয় ভূমিকা পালনের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। টেকসই উন্নয়ন প্রদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে এই ধরণের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সময় পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করা যাবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন থেকে শুরু করে ইকো-টুরিজমকে আরও উৎসাহ দেয়ার মাধ্যমে উপকূলবর্তী এলাকার পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। সমুদ্রে চলাচলকারী ও এর আশেপাশে বসবাসকারীদের মধ্যে নানা বিষয়ে সমন্বয় ঘটিয়ে সার্বিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

সমুদ্র সংক্রান্ত বিষয়ে সন্মিলিত প্রচেষ্টার কথা মাথায় রেখে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিশ্ব সমুদ্র দিবস উদযাপনের প্রতিপাদ্য উল্লেখ করা হয়েছে ‘সবাই মিলে আমাদের সমুদ্র রক্ষা করার ক্ষমতা আছে।’


*

*

Top