ক্রিকেট, রাজনীতি আর একটি হাইপোথেটিক্যাল প্রশ্ন

masud-kamal

মাসুদ কামাল: আমার মেয়ে বলল, বাবা জান, অনি আজ রোজা রেখেছে। অনিকে আমি খুব স্পষ্ট করে চিনি না। মেয়ের বন্ধু, এতটুক জানি। দু-একবার হয়ত দেখেছি, মেয়ের আরও অনেক বন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু রাস্তায় একা দেখা হলে কোনজন কে, কার কি নাম হয়ত বলতে পারব না। তারপরও ‘অনি’ নামটা আমার মনে গেঁথে গেছে। কারণ, সে রোজা রেখেছে। বাংলাদেশের বিজয় কামনা করে পুরো একটা দিন না খেয়ে থেকেছে।

এটা গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকালের কথা। বাসায় সবাই বসে টেলিভিশনে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ দেখছিল। সেখানে আমার বড় বোনও ছিল। এই ভদ্রমহিলা এখন দাদি-নানী হয়ে গেছেন। তার চোখে মুখেও বাংলাদেশের খেলা নিয়ে উৎসাহ আর উত্তেজনা কিছু কম দেখলাম না। আপা বেশ উৎসাহ নিয়ে জানাল, আগের দিন কোনো এক টিভিতে কাওরান বাজারের এক লোকের বক্তব্য প্রচার করেছে। ওই লোক নাকি বলেছে, বাংলাদেশের সাফল্য কামনা করে এরই মধ্যে সে ৫০ টাকা ফকিরকে দিয়ে ফেলেছে। আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ জিতে গেলে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করবে।

অফিসে যেতে হবে, তাই বাসায় সবার সঙ্গে বসে খেলা দেখা হলো না। সাড়ে এগারটার দিকে আমি বাসা থেকে বের হলাম। রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আজ কি হরতাল নাকি? তিনি বললেন, হরতাল কবে আছে কবে নেই সেটা এখন আর কেউ খেয়াল রাখে না। হরতাল আছে কি নেই, সেটা রাস্তাঘাটে গাড়িঘোড়া দেখে বোঝাও যায় না। আজ এই যে ফাঁকা অবস্থা এটা খেলার জন্য। বাংলাদেশের খেলা আজ, তাই কেউ ঘর থেকে বেরই হয়নি।

দেখা যাচ্ছে, হরতাল বা ভয়তাল, এই সবকিছুর চেয়েই বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের খেলা অনেক বেশি কার্যকর। বড় বড় নেতা-নেত্রীরা হরতাল আহ্বান করেন। মানুষ তারপরও রাস্তায় বের হয়। আর খেলা দেখার জন্য কেউ অনুরোধ করেনি, সরকারি ছুটিও দেওয়া হয়নি, তারপরও মানুষ ঘরে বসে থাকে। আসলে মানুষ যেটা মনে থেকে গ্রহণ করে, সেটি বাস্তবায়নের জন্য অনুরোধ যেমন করতে হয় না, তেমনি ভয় দেখিয়েও বেশি লাভ হয় না।

আমি কিছু বিষয় ঠিক বুঝি না। ক্রিকেট কি বাংলাদেশের প্রধান খেলা? ক্রিকেট তো বেশ ব্যয়বহুলও। বাংলাদেশের এমন পরিবারের সংখ্যা ৮০ শতাংশেরও বেশি, যারা তাদের সন্তানের হাতে একটা ক্রিকেট ব্যাট এবং একটা ক্রিকেট বল তুলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন না। এ খেলার নিয়মকানুনও বেশ জটিল। মাশরাফির একটা এলবিডাব্লিউ, রুবেলের একটা নো-বল নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। ওই এলবিডাব্লিউর আবেদনটি যথার্থ ছিল এবং রুবেলের বলটি ‘নো-বল’ ছিল না, এই মর্মে যদি স্বাক্ষর গ্রহণ করা যায়, আমি নিশ্চিত কয়েক কোটি স্বাক্ষর সংগ্রহ হয়ে যাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। অথচ এই সম্ভাব্য স্বাক্ষরদানকারীদের ৯৫ শতাংশ মানুষই কয়েক ঘণ্টা আগেও জানতেন না ‘এলবিডাব্লিউ’ এবং ‘নো-বল’ বিষয়টা কি?

যেটা আমাদের জাতীয় খেলা নয়, যে খেলা বেশির ভাগ মানুষ খেলেন না, বোঝেন না তা নিয়ে কেন এই উন্মাদনা? আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল এই খেলা চলাকালীন। সে খেলা দেখছিল না, অফিসে কাজ করছিল। আসলে সে কোনো খেলাই দেখে না, এসব সে তেমন বোঝেও না। তবে তার অফিসের সহকর্মীরা অফিসে বসেই খেলা দেখছিল। বেশ একটা হইচইও হচ্ছিল। বন্ধুটি বলল-আমি খেলা দেখি না, বুঝি না বলে দেখি না। কিন্তু এই যে ওরা সবাই দেখছে, আমার ভালো লাগছে। ভারতের একজন করে আউট হচ্ছে, আর আনন্দ করছে, এটাই বা কম কি? দেখ, খেলা তো কিছু না, এটা একটা উপলক্ষ্য মাত্র। রাজনৈতিক টানাপড়েন, পেট্রল বোমা, আগুনে পোড়া মানুষ, আচমকা গুম হয়ে যাওয়া নেতা, তা নিয়ে আবার সরকার দলীয় নেতাদের হাসিঠাট্টা, এই সবে মানুষের আসলে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দশা। এর মধ্যে এই যে খেলা, নির্মল বাতাসের একটা খোলা জানালা যেন। একটু থেমে আবার বলল, দেখ, বাংলাদেশে এই ক্রিকেট খেলার জোয়ারটা শুরু হয়েছে কবে? অথচ এই অল্প সময়ে এই বাচ্চা ছেলেরা দেশটাকে পৃথিবীর সেরা দশটা দেশের কাতারে নিয়ে গেছে। শতকোটি মানুষ কেবল ক্রিকেটের জন্য এই দেশটাকে চেনে। তোমাদের হাসিনা-খালেদা-এরশাদ তো নয়, দুনিয়া জোড়া বাংলাদেশের একটা পজেটিভ ইমেজ তুলে ধরেছে এই তরুণ ক্রিকেটাররা। এদের নিয়ে যদি একটু মাতামাতি হয়, হোক না।

একেবারেই অরাজনৈতিক আটপৌঢ়ে বন্ধুর কাছ থেকে এমন ভাষণ শুনে চুপ করে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখিনি। আসলেই তো, এই বৃহস্পতিবার এবং এর আগের কয়েকটা দিন, পুরো দেশ মেতে ছিল এই ক্রিকেট নিয়ে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় আমরা ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি, আমাদের দল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেছে, আমরা আনন্দে দিশেহারা। এমন প্রাপ্তি এবারই প্রথম। পুরো দেশ যোগ দিয়েছে এই উৎসবে।

কিন্তু আমার ওই বন্ধু রাজনীতির প্রসঙ্গটা তুলে আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে অন্য কিছু চিন্তা। বিরাট কোহলিকে আউট করার পর রুবেলের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশ যখন আনন্দে উদ্বেলিত, বিএনপির উধাও হয়ে যাওয়া নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের পুত্র-কন্যারা কি সেই আনন্দে মিলিত হতে পেরেছিল? তাদের মা তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অপেক্ষা করছিলেন স্বামীকে ফিরে পেতে হাতে স্মারকলিপি নিয়ে। অথবা হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আগুনে পোড়া ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা কাতর, তারা কি পেরেছিলেন সেই আনন্দ বেদনায় শামিল হতে?

রাজনীতি আমাদের ব্যক্তি জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। রাজনীতি আমাদের মিথ্যাবাদী আর দুর্নীতিবাজ হতে উৎসাহিত করছে। আমাদেরকে অসামাজিক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হতে প্ররোচিত করছে। আমাদের শিশুরা কি শিখছে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে? খালেদা জিয়ার সন্তান মারা যাওয়ার পর তাকে সমবেদনা জানাতে খোদ প্রধানমন্ত্রী সব রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে চলে যান। খালেদা জিয়ার অফিসে থাকা দুর্বিনীত ‘মহাজ্ঞানী রাজনীতিক’রা প্রধান ফটকে ভেতর থেকে তালা মেরে দেন, যাতে প্রধানমন্ত্রী ভেতরে ঢুকতে না পারেন। বিএনপির এই রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে কি শিক্ষা পেল আগামী প্রজন্ম? আবার বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ উধাও হওয়ার ঘটনায় খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ময়লার বস্তায় করে তাকে বিএনপি অফিস থেকে পাচার করে দেওয়া হয়েছে, তখনই বা কি শেখে শিশু-কিশোররা? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের আগে-পরে কতিপয় মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন সমাবেশে এনিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। তাদের কথার মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমেদের অন্তর্ধান নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ দেখা যায়নি। বরং দেখা গেছে, বিএনপিকে দায়ী করে অভিযোগ এবং হাস্যরস। মানুষের জীবন নিয়ে এমন নির্মম রসিকতা পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কি না, সন্দেহ। এসব দেখে, আমাদের সন্তানটি যদি পাশের বাড়ির মানুষের ব্যথা পাওয়া দেখে রসিকতা করে, বলে, ‘দেখো দেখো কি সুন্দর নাটক করছে,’ কেমন লাগবে আমাদের?

এখনো আমাদের ছেলেমেয়েরা ক্রিকেট না বুঝেই ক্রিকেটে জয়ের জন্য রোজা রাখে। সামান্য রিকশাচালক, যাকে ৫০ টাকা আয় করতে পুরো একটা ঘণ্টা কাঠফাঁটা রোদে একজন বাবু সাহেবকে পেছনে বসিয়ে প্যাডেল মারতে হয়, সে এর পুরোটাই মানত হিসাবে দান করে দেয়। সকল স্তরের মানুষের এই ত্যাগ, আবেগ কিন্তু কেবল ক্রিকেটের জন্য নয়, ক্রিকেটারের জন্য নয়, দেশের জন্য। আমাদের ছেলেরা ক্রিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পৃথিবীর সেরা দশ থেকে এবার সেরা আটে নিয়ে গেছে। এই আবেগপ্রবণ জাতির আকাক্সক্ষা আরও একটু সামনের দিকে যাওয়ার। ভালোর জন্য এই জাতি ত্যাগ করতে জানে। এই জাতি ভালোবাসতে জানে। কিন্তু আমাদের রাজনীতি এদেরকে হিংসা শিখাচ্ছে, ঘৃণা শিখাচ্ছে। আজ যদি বলা হয়, পুরো জাতি একদিন রোজা রাখলে অবসান হবে এই হিংসা, লোভ, আগুন আর রসিকতার রাজনীতির; আমি নিশ্চিত, একদিন নয় দুদিন না খেয়ে থাকতেও রাজি হবে সবাই।

একটা হাইপোথেটিক্যাল কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। আচ্ছা, এই যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, ওরা তো কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে গেছে, বেশ ভালোভাবেই হেরেছে, তারপরও দেশে যখন ফিরবে তখন ওদেরকে বেশ বীরোচিত সংবর্ধনাই দেওয়া হবে। সেই সংবর্ধনা সভায় অথবা এয়ারপোর্টে বসেই আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ওরা সবাই মিলে যদি আহ্বান জানায় চলমান এই হিংসার রাজনীতি অবসানের, ওদের পরিণতিটা কি হবে? কেউ তা একবার ভাবতে পারেন? ওদের এই যে অসাধারণ অর্জন, তা ধূলিসাৎ করে দিতে ওঠেপড়ে লাগবে তখন রাজনীতিবিদরা। হয়ত দেখা যাবে প্রতিদ্বন্দ্বী সব দলই তখন এক হয়ে গেছে। বলবে, রাজনীতি নিয়ে খেলোয়াড়দের কেন মাথা ঘামানো?

আসলে মাথা কেউই ঘামাতে চায় না। খেলোয়াড়, চাকরিজীবী, শ্রমিক, মজুর, ব্যাংকারসহ সব পেশার লোক নিজ নিজ পেশার মধ্যেই থাকতে চায়। কিন্তু রাজনীতি যখন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করে তখন রাজনীতি নিয়ে, রাজনীতিবিদদের নিয়ে না ভেবে কোনো উপায়ও থাকে না। এ মনোভাবের প্রকাশ্য প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে না বলে যে আগামীতে দেখা যাবেই নাÑএমনও ভাবা ঠিক নয়।


*

*

Top