আপনি কি বাংলা লিখতে পড়তে পারেন?

16880908_782010671953051_1532796362_o

টিবিটি শিক্ষা: আমি সমগ্র ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেছি এবং এ বিশাল ভূখণ্ড খুজেও একজন ভিখারী ও নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তি পেলাম না। অঢেল সম্পদ, মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ও কর্মস্পৃহা অতুলনীয়।  ভারত ভেতর থেকেই অজেয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ।  অতএব, আমার বিবেচনায় যতক্ষণ পর্যন্ত এ জাতির মেরুদন্ড অর্থাৎ আধ্যাতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংশ করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত এ জাতিকে কোনভাবেই জয় করা সম্ভব নয়। সুতরাং, আমি প্রস্তাব করছি ভারতের সনাতন শিক্ষাব্যবস্থা কৃষ্টি ও সংস্কৃতি পাল্টে ফেলে, ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে হবে, যাতে করে একদিন ভারতীয়দের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মায়: ইংরেজি ভাষা ও কৃষ্টিই শ্রেষ্টতর। এভাবেই হয়ত একদিন তারা নিজেদের অজান্তেই আত্মমর্যাদাবোধ ও নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে দেউলিয়া হয়ে পরবে।  আর আমরা যেভাবে চাইব সেভাবেই তারা আমাদের অনুসরণ করবে, ভৃত্য ও পরাধীন জাতির মত। শত চেষ্টা করেও মানুষের দৈহিক অবয়বকে পরিবর্তন হয়ত সম্ভব নয় কিন্তু আমরা অবশ্যই এমন একটি শ্রেণীর বিকাশ ঘটাব যারা রক্তে-মাংশে  ভারতীয় হবে, কিন্তু রূচি, বুদ্ধি,  চিন্তা-চেতনায় ইংরেজ হবে… ——-লর্ড ম্যাকঅলে, বৃটিশ পার্লামেন্ট, ১৮৩৫।

 ভাষার নব্য ঔপনিবেশিক চেহারা।  সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজকে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা করবনা।  শুরুতেই আমার অবস্থান পরিষ্কার করছি: ইংরেজিসহ যেকোন ভিনদেশী ভাষা, এমনকি সংস্কৃতির প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আক্রোশ নাই, বস্তুত আক্রোশ করেও লাভ নেই, বিশ্বায়ণের বাস্তবতা, তবে দেশী-বিদেশী ভাষার ‘অহেতুক’ জগাখিচুড়ি কেন যেন একটু শ্রুতিকটুই মনে হয়। কেন শ্রুতিকটু মনে হয় তার উত্তরটা বোধহয় ৫২তেই দেয়া হয়ে গেছে। ঘটনায় ফিরে আসি।  বর্তমান প্রজন্মের ‘ব্যাঙলাডেশী’ ছোকরারা এখন বহুত অত্যাধুনিক। আধুনিকতার যাবতীয় মাপকাঠি অতিক্রম করে তারা মগ ডালের বানর থেকে অট্টালিকার হনুমান প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়েছে। লাগামহীন তথ্য প্রযুক্তি ও আকাশ সংস্কৃতির বেপরোয়া বাস্তবতায় এই বিবর্তনবাদ সহসাই চলমান। আসন্ন ধাপ জঙ্গলার শিম্পাঞ্জি: দুর্বোধ্য আচরণ। এরপরে কি ধরনের রুপান্তর হবে তা আপনারা পাঠকরাই ভালো আন্দাজ করতে পারবেন বলে মনে হয়। মূল কথায় আসি। পোল্ট্রি ফার্মের গদগদ ‘ব্যাঙলাডেশী’ ছাওয়ালরা ক্রমান্বয়েই গৌরবান্বিত বাংলাদেশী নাগরিকতার আত্ম-গৌরব ও ওজন হারাচ্ছে।

 গো বেচারারা হয়ে পড়ছে জাতিহীন, ধীরে ধীরে। অর্থাৎ যেই ভিনদেশী অপসংস্কৃতির অতিরঞ্জিত অনুকরণ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন বন্ধুদের কেউ কেউ, কিন্তু সেই দেশগুলোতেও তাদের বন্দোবস্ত হওয়ার নুন্যতম কোনো সম্ভাবনাও দেখছিনা। অর্থাৎ তাদের এই বাঙলায়ই পরে থাকতে হবে। ধানসিড়ির শালিকটি হয়ে নয়, উলুখাগড়া অথবা পাতিকাকের মত অবাঞ্চিত হয়ে। তবে মেধা পাচার ভিন্ন জিনিস, ভিন্ন বিতর্ক ও বাস্তবতা। আজকের বিষয়বস্তু তা নয়। আমি বরং বলছি আদার ব্যাপারীদের কথা। যারা অযথা ইংরেজি শব্দের জোরপূর্বক আমদানি ঘটান, একটু নিজেকে তথাকথিত আধুনিকতার ভান ধরে সঙ সাজার বৃথা চেষ্টা করেন এবং সেটা বুঝেতেও পারে না। এই সকল আশু শিম্পাঞ্জিদের আচরণ দেখে মনে হয়–ঠিক পাবলিক বাসের কন্ডাকটরের মত অনিচ্ছাকৃত হাসি আর যেকোনো প্যাসেঞ্জারদের মামা ডাকার মত সস্তা প্রচলন।গত কয়েক সপ্তাহ আগের এক শহুরে অভিজ্ঞতা। গুলশানের কোনো এক লোকায়ত রাস্তা। কিছু এদেশীয় ভুড়িভোজী বন্ধুদের আখড়ায় আড্ডা দিতে যাই। ‘আন্ডার-গ্রাউন্ডে’। পরিত্যক্ত গ্যারেজ। অন্ধকারাচ্ছন্ন দেয়াল আর অধুনা একটা কফি শপ।

 ছোট্ট ভেন্টিলেটর গুলো ছাপিয়ে হঠাতই ঢুকে পরত যানবাহনের গুমোট শব্দ। নিস্প্রভ নিওন আলোর বহুমাত্রিক রশ্মির জলকানি, আবদ্ধ রুমটায়। দেয়ালে এলোমেলো কিছু আকাবুকি চোখে পরে। এমন ভাবে আকা মনে হচ্ছে বহুকালের পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া গরুত্বপূর্ণ দেয়াল-চিত্র কর্ম, আসলে তা নয়। একটা ‘এন্টিক’ চেহারা নিয়ে আসা জন্যই এভাবে আকা হয়েছে। চিত্রগুলোতে প্রায় সবাই পশ্চিমা সঙ্গীতের রথী-মহারথীরা। আমাদের একটা লালন অথবা রবীন্দ্রনাথও শোভা পায়নি ওদের লাল-নীল্ দেয়ালে। অবিরত বেজে চলছে স্যার এলটন জনের কালজয়ী গান গুলো। অথবা লিঙ্কিন পার্কের ‘অল্টারনেটিভ মেটাল’। প্রায়শই গার রঙের স্কার্ট পরা বান্ধবীদের আবদারে বেজে উঠত পিটবুল অথবা জ্যানিফার লোপেজের কোনো জগৎখ্যাত তুমুল জনপ্রিয় ট্র্যাক। না হয় আমাদের লালন-রবীন্দ্রনাথ অনেক পুরনো হয়ে গেছে এতদিনে। দলছুট-শূন্য-শিরোনামহীনও কি একবারও বাজতে পারতনা? জলের গানে সাদামাটা একটা গানও অন্তত শুনতে পারতাম অথবা নূতন সঙ্গিতীয় সরঞ্জামে ফিরে আসা হারানো দিনের কোনো তুমুল জনপ্রিয় একটা গান, সারাবিশ্বেই হারানো দিনের গানের রিমিক্স হয়, হয় না শুধু এখানেই।

বলি কেন এই দেউলিয়াপনা? বাঙলার জল, বায়ু ও মাটি আর চর্চা আল্টান্টিক পারের রাতের সংস্কৃতির? উত্তর আপনারা পাঠকরাই দিয়েন।আড্ডার ব্যস্ততায় অনেক ‘বয়ান’ শুনি, শুনতে হয়। বচনগুলো সারাংশ করলে যা দাড়ায়: ..গুলশান-ব্যানানী, ফ্যাস্ট ফুড আর ‘গেইমস’ (অশরিরীয়)। এই শব্দগুলোই ঘুরে ফিরে আসত বার বার। মাঝে মধ্যে ভুলভালে ভাড়া বাসার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও চলে আসত ওদের আলোচনায়। বিলবোর্ড, টপচার্ট অথবা ‘ভাইরাল’ কোনো ইউটিউব ভিডিওর গালগল্প তো ছিলই। আমার ‘ডেশী’ বন্ধুরা সাইজে একেকটা মস্ত জলহস্তী আর কানফাটানো বিকট তাদের অট্টহাসি। কারণে অকারণে, ‘হুদা-ই চিল্লায়’। হিন্দী-ইংরেজী ও ‘ইয়-ইয়’ ভাষার বলাত্কারীয় মিশেল। শুনেছি তাদের ‘স্পিকিং জোস’। যেমন, ফিল…লাইক…ওয়াও….কুল…ব্লাহ ব্লাহ….ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন আমারতো মনে হয় একুলো না ওকুল না। বকুল। না সম্পূর্ণ হিন্দি, না বিশুদ্ধ ইংরেজি, এদিকে বাঙলা তো অক্কা পেয়েছে বহু আগেই, তবে যেটা হয়েছে সেটা তাদের ‘ব্র্যান্ডের’ ‘ব্যাঙগুলি’ ভাষা।

বিশ্বায়নের এ যুগে আপনি বিশ্ব নাগরিক হতেই পারেন। এদেশের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে উন্নত নাগরকি সুবিধার আশায় পাড়ি জমাতেই পারেন ইউরোপ অথবা আমেরিকায়। ভুলে যেতেই পারেন নদীমাতৃক এই বঙ্গীয় বদ্বীপটার কথা। সবাই তো ভুলে যায়, কেউ কথা রাখে?। আর ঐদিকে রপ্ত করতেই পারেন অসংখ ভাষার বাহাদুরি। ভালো কথা। কিন্তু বাংলাকে অবজ্ঞা করার নৈতিক অধিকার কি আপনার আছে? হিন্দি-ইংরেজ খিচুরী করে ‘হিঙরেজ’ বলেন আপত্তি নাই। কিন্তু আমাদের রক্তে কেনা বাঙলা আর উপনিবেশিক ইংরেজির পাঁচমিশালিতে ‘ব্যাঙরেজ’ হইয়েননা। অহেতুক কেন গুরুচন্ডালি করবেন না জানেন? চলুন ফিরে যাই ৫২ তে। কি পেলেন? তত্কালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জিন্নাহ কর্তৃক আরোপিত উর্দু ভাষায় বাধ্যতামূলক কথা বলার বিরুদ্ধে গণসংগ্রাম হয়েছিল। পূর্ব পুরুষরা এ ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন। অঝোরে রক্ত বলিদান করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে, সারাদেশে সেদিনের উত্তপ্ত রাজপথে। ফলশ্রুতিতে আজ সারা বিশ্বে ইউনেস্ক একুশে ফেব্রুয়ারীকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা’ দিবসের বিরল সন্মাননা দিয়েছে, সারাবিশ্বে উদযাপিত হয়। হ্যা, আমাদের ভাষা আন্দোলন। যে দিনটায় পৃথিবীর সকল ভাষা ভাষী মানুষেরা তাদের প্রিয় মাতৃ ভাষাকে শ্রদ্ধা জানায়।

 তামাম দুনিয়া খুঁজে এমন একটা ঘটনা বের করতে পারবেন? পা-র-বে-ন না। এখানেই ভাষা-গোষ্ঠী বাঙালি জাতি বিরল ও গৌরবময়। মধ্য প্রাচ্যেসহ উত্তর আফ্রিকার বিস্তর মরুভূমির ভাষা আরবির পরেই বাংলার স্থান। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ফরাসী, রুশ ও স্প্যানিশ ভাষাগুলোর চেয়ে বাংলা ভাষায় ঢের বেশি মানুষ কথা বলে। জনপ্রিয়তায় পর্তুগিজ ও জার্মান ভাষাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অধিকন্তু, মাতৃভাষায় কথা বলার জরিপে দুইশ আশি মিলিয়ন (মোট তিনশ মিলিয়ন) মানুষের ভাষা।  প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ভাষার মধ্যে আপনার আমার বাংলা ভাষা পৃথিবীতে ষষ্ঠতম স্থান অধিকার করে আছে। জুড়ে আছে সমগ্র বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, দক্ষিন আসামের বরাক নদীর উপত্যকা, ত্রিপুরা (এই তিনটি প্রদেশের দাপ্তরিক ভাষা), বিহার, উড়িষ্যা ও আন্দামান নিকোবর দীপপুঞ্জ প্রদেশ গুলোতেও উল্লেখযোগ্য ব্যবহার আছে। ২০১১ সালে ভারতের ঝারখন্ড প্রদেশে বাংলাকে দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। ঘোষিত ২৩ টি দাপ্তরিক ভাষার একটি হলেও, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহৃত ভাষা হচ্ছে এই বাংলা ভাষা। আমি মনে করি বাংলা ভারতের জাতীয় ভাষার মর্যাদা পেতে পারে। কিন্তু হিন্দি ভাষার নব্য ঔপনিবেশিকতায় তা বুঝি আর সম্ভব হয়ে উঠবেনা।

 ভারত ও বাংলাদেশের বাইরে পাকিস্তানের করাচি নগরীতে বাংলা দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃত। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বিভাগ’ নিয়মিতভাবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ছাত্র ভর্তি করা হয়ে থাকে। মনে হচ্ছে ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে ভালই শিক্ষা নিয়েছে পাকিস্তান, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। উপমহাদেশীয় আঞ্চলিক সংহতিতে বাঙলা অনবদ্য ভুমিকা রেখেছিল। নজীরবিহীনভাবে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীতগুলো সর্বপ্রথম রচিত হয় এই বাংলা ভাষায়। শুধু কি তাই? সরল রেখায় প্রায় সতেরোশ কিলোমিটার দুরের দেশ, পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষার বিরল সন্মাননা দেয়া হয়েছে। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশটির প্রেসিডেন্ট, আহমাদ তেজান কাভাহ বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের কর্তব্যরত ৫,৩০০ জন বাংলাদেশী জোয়ানের অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রতি এভাবেই কৃতজ্ঞতা জানাল ২০০২ সালে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভ্রাতিপ্রতিম দেশটি।

 ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা তাদের স্ব স্ব সংসদে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য প্রস্তাবনা আনেন। এর বহুকাল আগেই স্বমহিমায় ভাস্বর বাংলা ভাষা রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির হাত ধরে বিচরণ করা শুরু করে বিশ্ব সাহিত্যের রাজকীয় দরবারে। খেতাব জোটে ফরাসী ভাষার পরে সবচেয়ে ভাবপ্রবণ ভাষার। আর অর্জিত হয় পশ্চিমা দুনিয়ার সর্বশেষ্ঠ সন্মাননা নোবেল প্রাপ্তি (যদিও তাতে কিছু যায় আসে না)। এদিকে একঝাক বাঙলার নক্ষত্র নজরুল, জীবনানন্দ, বঙ্কিম, বিভূতিভূষণ, সুফিয়া কামাল, মধুসূদন, মানিক বন্দোপাধ্যায়,  সরতচন্দ্র, সত্যজিত, সুকুমার, মীর মশাররফ হোসেন অথবা আজকের হুমায়ুন আহমেদ, শামসুর রহমানসহ অনেকে (আপনারাও কিছু নাম উল্লেখ করতে পারেন)। ভাষা আন্দোলন পরবর্তী রেনেসা/পুনর্জাগরণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ভাষা ও সাহিত্যকে আরো সুসংহত ও মজবুত করেছে। এযুগের সাহিত্যিকগণ এই চেতনার ধারক ও বাহক।

 কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলি, এদেশে দলীয় অপরাজনীতির ডামাডোলে আজ বৃহত্তর যুবসমাজ রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়ছে। ছাত্র রাজনীতির অতীত গৌরব ভুলতে বসেছে। ভুলে গেছে তিতুমীর, প্রীতিলতা, সূর্য সেন, শরীয়তুল্লাহ ও মৌলানা ভাসানীর নাম। এরা ছিলেন আমাদের ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রাণপুরুষ, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। বর্তমান প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে দ্বিদলীয় অপরাজনীতি, লাগামহীন দুর্নীতি ও অগণতান্ত্রিক পরিবারতন্ত্রই দায়ী। রাজনীতি যখন এসেই পড়ল, একটু বলি। বাংলা ভাষা ওপারের অসমীয়া, উড়িয়া ও বিহারী ভাষার কাছাকাছি। তাছাড়া বরিশাল, সিলেট, নোয়াখালি ও চট্টগ্রামের মত আলাদা রকমের বহু উপভাষাও আছে। এদের মধ্যে কিছু ভাষার উচ্চারণ আবার কটমটে। বোঝার অসাধ্য। ধরুন আপনি পঞ্চগড়ে থাকেন। চট্টগ্রামের টেকনাফে বেড়াতে গেছেন। একবার ভাবুন কি দশা হবে আপনার?

কথা বলতে বুঝতে কতইনা কষ্ট হবে! অনেকে চট্টলা বা সিলোটি উপভাষাকে বাংলা বলতে বেজায় নারাজ। বাংলা ও অসমিয়ার সংমিশ্রণে চাটগাইয়া বুলির উত্পত্তি। একেবারে সিলেট পর্যন্ত এ উপভাষার বিস্তৃতি। অন্যদিকে বার্মার (মায়ানমার) আরাকানের (রাখাইন রাজ্য) রোহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠিও এই উপভাষায় কথা বলে। তাই অনেকেই ভাষাটিকে সতন্ত্র আরেকটা ভাষা বলে চালিয়ে দেন (যেমন বিশ্বের ৬৫ তম ভাষা)। এই অসস্থিকর পরিস্থিতি দূর করতে পশ্চিম বঙ্গ ও বাংলাদেশ উভয়েই ভারতের পশ্চিম-কেন্দ্রীয় ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা নদীয়ার বাংলা উপভাষাকে মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করে। এতে করে সর্বজন গৃহীত বাংলার একমুখী প্রচলন শুরু হয়। ততদিনে বড্ড দেরী হয়ে গেছে মশাই। এই সুযোগে আসাম রাতারাতি তাদের লিপি পরিবর্তন করে পুরো ভাষাটাকেই নূতন একটা জাতিগত ভাষায় রুপান্তরিত করে ফেলেছে। নাম: অসমীয়া। সংবাদপত্র থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ে পড়াশুনা আসামে এখন একচেটিয়া অসমীয়ার বাধ্যতামূলক ব্যবহার হচ্ছে।

 তারা তাদের উপভাষাটাকেই মূল ভাষা বানিয়ে ফেলছে। আর পরিহার করছে সর্বজন বিদিত শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার। একে অসমীয় জাতীয়তাবাদ বা ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদও বলা যেতে পারে। তাই এই ভাষাগত সাতন্ত্রতা কেবলই রাজনৈতিক। আসামের প্রাদেশিক সরকার কেবলমাত্র অসমিয়াকেই প্রাদেশিক ভাষা করতে চেয়েছিল। পরে অবশ্য আসামে বসবাসরত প্রায় ত্রিশ ভাগের মত বাঙালিদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে সরকার তাদের এ অনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙালির কোনো ব্যাকরণ গ্রন্থ ছিলনা। পর্তুগিজ ও পরবর্তিতে ইংরেজরা সর্বপ্রথম বাংলা ব্যাকরণ বা শব্দ কোষ তৈরী করে (যাতে করে আরো শোষণ করা যায়)। আমাদের মধ্য থেকে সংস্কারবাদী সমাজবাদী রাম মোহন রায় প্রথম বাঙালি হিসাবে ব্যাকরণ বই লিখেন।

আমার দায়ভার থেকে আবহমান বাঙলার আত্মকাহিনীর কিছুটা এখানে বর্ণনা করলাম। আপনাদের কাছে নালিশ করলাম কিছু বিকৃতি ও অপচর্চার। সমাপ্ত করলাম এখানেই, তবে নিতান্তই অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। আশা রাখি আপনাদের মধ্য থেকে কেউ দায়িত্ব নিয়ে অসমাপ্ত এই বাঙলার গুণকির্তন করে যাবেন, লিখায়, বলায় ও চর্চায়…. মহোদয়, ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষই #‎বাঙলা ভাষায় কথা বলে। অতএব, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হওয়া উচিত?”—শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পাকিস্তান গণপরিষদ। ফেব্রুয়ারী ২৩, ১৯৪৮।  জয় বাঙলা, বাংলা চিরজীবী হোক! লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত। ইমেইল: rakibeca@gmail.com


*

*

Top